অসীম সীমানায়: মননশীলতার শুদ্ধতম প্রকাশ।। সুজন রায় রুদ্র

মঙ্গলবার, জুলাই ৩১, ২০১৮ ২:১৮ অপরাহ্ণ
Share Button

কবিতা নানারূপে জ্বলে উঠেছে যুগে যুগে তার নিজস্ব আলোয়, আপন আনন্দে। সেই আনন্দের ভাগীদার প্রথমত অবশ্যই কবিতা পাঠক, কবিতাপ্রেমী। একই কবিতা একেক পাঠকের হৃদয়ে একেকভাবে আলোড়ন তোলে। কেননা কবিতা শুদ্ধতম শব্দ আর বোধ নিয়ে খেলা করে। সৃজনশীল ও মননশীলতার শুদ্ধতম প্রকাশ কবি সুবাস রায়ের “অসীম সীমানায়” পাঠকের কাছে নতুন নতুন বোধের জন্ম দিতে পারে। কবি তাঁর প্রথম কবিতাটির মধ্য দিয়ে আমাদের বোধকে জাগিয়ে দেন একটু ভিন্নতর মাত্রায় অন্তরাত্মার সুদূরে ভ্রমণের চিত্র তুলে ধরে। কবিতাটির রুপকল্প এবং চিত্রায়নে সৃজনশীল ভাবনার অনুপ্রাস ঘটেছে। কবিতাটির কয়েকটি লাইন বলা যেতে পারে-

বহুদূর পথ হেঁটে
তাকাই ফিরে
সীমানার ওপাড়ে
কে অতি ধীরে
ডাকে আমায় বারবার
যেন সুদূর পারাবার
থেকে
এঁকে
জীবনের নীল সীমা
দেখায় মানসপ্রতিমা
হৃদয়ের সাগরপাড়ে।’’ (সীমানার ওপাড়ে; পৃষ্ঠা ৯)

মানুষের চাওয়া-পাওয়া অসীম। আর এই চাওয়া-পাওয়ার মাঝে বাঁধাও অসীম। একটি বাঁধা অতিক্রম হলে আরেকটি বাঁধা এসে হাজির হয়। আর এই অতিক্রমণ করতে পারা না পারার মাঝেই সৃষ্টি হয় আনন্দবেদনার গল্প, স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতার গল্প। জীবনের এ কঠিন সীমারেখা কখনও হাসায় কখনওবা কাঁদায়। জয় হয় স্নেহ-ভালোবাসার। কবির কাব্যগ্রন্থের শুরুতে ভালোলাগা যে, তিনি শুরুতেই গণমানুষের কথা বলেছেন। খেটে খাওয়া দ্বীন-দুঃখী মানুষের কথা বলেছেন। যেখানে তিনি অনাহার, দুঃখক্লীষ্ট জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। কবির কবিতায়-

একবুক স্নেহে চোখের জল ফেলে বুবু
অন্যদিকে তাকায়
আকাশের তারা গোনে
ভাইয়ের চোখ এড়াতে।
জড়িয়ে নেয় ছোট্ট ভাইটিকে
ছেঁড়া জামার ভেতর লুকিয়ে রাখা
স্নেহসিক্ত বুকে। (আনন্দবেদনার গল্প; পৃষ্ঠা ১০)

মানুষের জীবনের সফলতা আর ব্যর্থতার অসীম সীমানা অতৃপ্ত মনকে জীবন-অধ্যবসায়ের শিক্ষা দান করে। যেমনটি কবি বলেছেন-

বারবার কিনার ছুঁতে গিয়ে
কিনারবিহীন গল্প নিয়ে ফিরে আসি
খুঁজে-ফিরি বালুকনা সমুদ্রে
অতল তলদেশে হাতরাই
প্রতিবার নতুন অভিলাষে। (সীমানার মাঝখানে; পৃষ্ঠা ১১)

অধ্যবসায় মানুষকে সহনশীল ও ধৈর্যশীল করে গড়ে তোলে। তবুও জীবনের অসীম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মানুষ বারবার হতাশায় নিমজ্জিত হয়। কবির কথায়-
আলোহীন এতটা পথ
পেরিয়ে দেখলাম
আলোহীন জীবন আমার
চলার পথে
অন্ধকারকে ভালোবেসেছে। (শিলাপাথরের ভালোবাসা; পৃষ্ঠা ১২)

মানুষের এই হতাশা অর্থ, বিত্ত, চিত্ত এবং শুদ্ধ হৃদয়ের অসীম অভাববোধকে প্রকাশ করে। যে অধ্যবসায়, যে স্বার্থহীন লক্ষ্য মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়, সকল সীমানাকে ভেদ করে তাঁদের জীবনে রচনা হয় ভালোবাসার জয়গান-

যে ভালোবাসে
শিলাপাথরের মাঠকে
তার জন্য ফুল হাসে
সমস্ত বাগানজুড়ে। (শিলাপাথরের ভালোবাসা; পৃষ্ঠা ১৩)

অসীম ভালোবাসার শক্তি মানুষের শুদ্ধ অনুভূতি ও মহানুভবতার হৃদয়কে জাগ্রত করে। ফলে মানুষ বিন্দুতে সিন্ধু খুঁজে পায়-

এখানে একদিন
সব পেয়ে যাব
অল্প পাওয়ার
আনন্দ-উল্লাসে। (অল্প পাওয়ার আনন্দ-উল্লাসে; পৃষ্ঠা ১৫)

কবি সুবাস রায়ের কাব্যগ্রন্থে মাটি, মানুষ, প্রেম ও প্রকৃতির রূপায়ণ যেন এক নতুন পৃথিবী। তিনি প্রেমেরও কবি। অসাধারণ উপমায় লিখেছেন-

কৃষ্ণচূরায় রং লাগলে
আকাশটা নীল শাড়ি পরলে
রাজহাঁস নদীজলে ভাসলে
চন্দ্রটা আকাশে হাসলে
তোমাকে আমার মনে পড়ে যায়। (তোমাকে আমার মনে পড়ে যায়; পৃষ্ঠা ১৬)

কবির মতে, প্রেম আকাশ আর সাগরের মতোই অসীম। তিনি অফুরন্ত প্রেমের গভীরতম বোধে এক অকৃপণ হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন-

তোমার প্রতি আমার যে-প্রেম
সে-তো সাগরের মতো গহিন
যত দিই তোমারে
তত আরও বাড়ে
দেনাপাওনা হয় সীমাহীন। (সীমাহীন; পৃষ্ঠা ৩৮)

প্রেমের কবি জীবনানন্দ দাশের মতো কবি তাঁর কবিতায় নারী প্রেমের কথা বলেছেন। যা একটি নারীময়ী সত্তা পৃথিবীকে করেছে আরও সবুজ আরও মঙ্গলময়। তার ভেতরে জ্বালিয়ে রেখেছে শান্তিবাতি। নারীপ্রেমের উপমায় কবি অসাধারণ শব্দশৈলীতে লিখেছেন-

ভীরু বালকের মতো
তোমার দিকে
ফুলের পাপড়ির মতো
তোমার ঠোটের কোণে তাকিয়েছিলাম
তাকিয়েছিলাম ছোট্ট শিশু যেভাবে রাজহাঁস দেখে
আর খেলার কথা ভুলে যায়। (জীবনানন্দে তুমি; পৃষ্ঠা ৫০)

ভালোবাসা জীবনবোধের খুবই অন্তরঙ্গ অংশ। তাই ভালোবাসা জীবনের সন্ধি এবং হৃদয়ের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। এই গভীরতম ভালোবাসায় প্রকাশ পেয়েছে কবির শুদ্ধতম আকুতি-

ভুলে যাওয়ার সাধনা আমি করতে পারব না
ক্ষমা করো, নন্দিতা
আমি কখনই তা পারব না। (জীবনানন্দে তুমি; পৃষ্ঠা ৫২)

 

আবার ভালোবাসা মানে যে শুধু কাছে পাওয়া তা নয়। কবির ভালোবাসার অনুভূতি ও বোধে ত্যাগের মহিমাও প্রকাশ পায়-

বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও
ঠিক রেখো নিরন্তর
অন্তহীন পথচলা…..। (অন্তহীন পথচলা; পৃষ্ঠা ৪০)

কবি সুবাস রায়ের কবিতা শুধু ছন্দবদ্ধ বাক্য নয়; প্রত্যেকটি কবিতা ভাবনার গভীরতর প্রকাশ। বাস্তবতার দর্পণস্বরূপ। প্রকৃত জ্ঞানকে সত্যদৃষ্টিতে অবলোকন করলে দেখা যায় সন্তানের প্রতি স্নেহ-মায়া-মমতা ভালোবাসায় একজন মা কতটা কষ্ট, কতটা যাতনা সহ্য করেও সহাস্যমুখে সন্তানকে লালন করেন,সন্তানের মঙ্গলকামনায় প্রার্থনা করেন। কিন্তু বিনিময়ে হয়তো সন্তানের অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে নিরব কান্নায় ভেসে যায় চোখ। প্রকৃত দায়িত্ব-কর্তব্যের বোধহীনতায় সন্তানেরা অন্য উৎসবে মেতে ওঠে, ভুলে যায় প্রকৃত দেবীকে-

সন্তান আমাকে মন্দিরে দেখতে পায়
ভালোবাসে,
কতো যত্ন নেয়
গৃহে চেনে না আমাকে!
মন্দিরে সারাক্ষণ পুজো নিই হাসিমুখে
চোখের জল ফেলি গৃহে ফিরে এসে। (আনন্দময়ীর ক্রন্দন; পৃষ্ঠা ২০)

মা তো চির মমতাময়ী। ক্ষমা ও দয়ার অসীম সাগর । তাই কবি সকল অবোধ সন্তানের হয়ে যেন মায়ের কাছে ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে আশীর্বাদ প্রার্থণা করেন-

ক্লীষ্ট হৃদয় আমার
পূর্ণ করো ক্ষমায়
দূর করো অশান্তি চরাচর থেকে
শান্তির জয়টীকা অন্তরে দাও এঁকে। (আশীর্বাদ; পৃষ্ঠা ২৩)

পুরুষশাষিত সমাজে নারী তাঁর স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হলেও সমাজে অবহেলিত। তাই কবি সমাজে, রাষ্ট্রে নারীশক্তির ভূমিকা ও অবদানের কথা অনুধাবন করে নারীশক্তিকে ভিন্নভাবে জাগানোর কথা বলছেন-

ভক্তি নয় মুক্তি নয় তোমাদের আজ শক্তি চাই
অশ্রু নয় ক্রন্দন নয় মমতা থেকে মুক্তি চাই
দেশের জন্য সবার জন্য তোমাদের অবদান
সূর্যের মতো চিরকাল থাকবে দীপ্তিমান। (সূর্যের মতো অম্লান; পৃষ্ঠা ২৪)

সময়ের ক্রমবিবর্তনে আদিম সমাজ থেকে সভ্য সমাজের উত্তরণ ঘটেছে। তৎসঙ্গে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম শ্রেণি বিভাজন। দার্শনিক কার্ল মার্কস এই শ্রেণি বৈষম্যে পৃথিবীর সমস্ত শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র নিপীড়িত মানুষের কথা বলেছেন। তাদের মু্ক্তির আলো দেখিয়েছেন। সেরকমভাবে কবিও শোষক ও শোষিতের কথা তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন-

যেখানে তারা রচনা করে
সভ্যতার গান
তারা কি তোমাকে বেসেছে ভালো
খুঁজেছে তোমার প্রাণ? (তুমি যাকে ভালোবেসে; পৃষ্ঠা ৪৪)

আবার শোষিত শ্রেণির পরিশ্রমে শোষক শ্রেণি ফুলে উঠে। কারও পৌষ মাস হয় আর কারও সর্বনাশ-

তুমি তো গড়ে দিলে তাদের
অহংকারের ছাদ
ছাদের তলে কাটায় তারা
বিলাসিত রাত। (তুমি যাকে ভালোবেসে; পৃষ্ঠা ৪৪)

শাষক আর শোষণের কথায় মুক্তিযুদ্ধের কথা চলে আসে। কবি দেশপ্রেমকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরে লিখেছেন তাঁর ভালোবাসার স্বদেশকে নিয়ে। একটিকে তিনি যেমন ৫২’র ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে একটি অবুঝ শিশুর মহান আত্মত্যাগের মাহাত্ম্যকথা তুলে ধরেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থটিতে তেমনি মাতৃভূমির প্রতিও গভীর মমত্ববোধের পরিচয় মেলে। যা বাংলাভাষার গুরুত্ব এবং বাঙালির জাতীয় চেতনাবোধে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে-

প্রভাত এলো
লালজামা লালরক্ত আর লালসূর্য
হলো লাল বর্ণমালা
ফুলে ফুলে ভরে গেল
শহীদমিনার। (লালজামাওয়ালা ছেলেটি; পৃষ্ঠা ৪৮)

একটি ধ্রুপদী সত্য এই যে, ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপন হয়েছিল। সেই ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হচ্ছেন শুদ্ধতম বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নাগরিক জীবনের টানাপোড়েন ও অনুভূতিহীন মানুষের রক্তচক্ষু অবলোকন করেছেন কবি। তাঁর সাহসী উচ্চারণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতা অনুধাবন করলে বোঝা যায় তিনি কীভাবে অপশক্তির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তাঁর কবিতার মধ্যে প্রেম ও দ্রোহের চিত্রায়ণ সহজেই লক্ষ্যণীয়-

ধিক দিতে ভুলে যাই
পাশবিক প্রেতাত্মা এখন
আমার আত্মায় আত্মায়! (শুদ্ধতম বাঙালি; পৃষ্ঠা ৩০)

মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ-অবধি বাংলাদেশের মানচিত্রে, ইতিহাসের পাতায়, বাঙালির চেতনায়, হৃদয়ে-স্পন্দনে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন যুগান্তরের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-

তুমি একা কারও নও
তুমি সকলের
তুমি কোনো কালের নও
তুমি চিরকালের
নশ্বর নও তুমি
তুমি অবিনশ্বর। (যুগান্তরের পিতা; পৃষ্ঠা ৩১)

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় চেতনাবোধ প্রকৃষ্টরূপে শক্তিশালী হয়। বাংলার আপামর জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে মানুষের যন্ত্রণা, পীড়ন বিধস্ত জনপদ কবির ভাবনার জগতকে যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসে। অধিকারবঞ্চিত বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের জুলুমবাজ নীতি ও অন্যায়-অত্যাচার অপরপক্ষে স্বাধীনতা লাভে বাঙালির তীব্র ইচ্ছে, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আত্মত্যাগ এবং কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতালাভের আনন্দাশ্রু নিয়ে এক পিতৃ-মাতৃহারা সন্তানের আত্মচিৎকার চিত্রায়িত করেছেন কবি তাঁর কবিতায়-

পদ্মা যমুনা মেঘনার তীরে চিৎকার
করে বলি,
মা তুমি কই…
বাবা তুমি কই…
ওরা আমাকে বলে,
এইতো আমি তোমার কাছে-
পদ্মা মেঘনা যমুনা হয়ে বই। (শিমুলের গহনা; পৃষ্ঠা ২৭)

কবি সুবাস রায়ের কাব্যগ্রন্থ পাঠ করলে দেখা যায়, তাঁর দর্শনে-চিন্তায়, কল্পনায়-স্বপ্নে, বর্ণনায়-চিত্রায়ণে বারবার মানুষের জীবনবোধে অসীম সীমানার কথা বলেছেন। জীবনে একটি প্রাপ্তি ঘটলে আরেকটির অভাববোধ মানুষকে তাড়িত করে-

এখানে ফুল ফোটে বসন্ত আসে না
বসন্ত আসে তো ফুল ফোটে না
শীতের দীর্ঘ জীবনে বিলম্বিত বসন্ত
পুনর্জন্ম প্রার্থণা করে। (অসীম সীমানায়; পৃষ্ঠা ৬২)

মানুষের জীবনের এই অসীম সীমানাকে মানুষ অতিপ্রাকৃত শক্তির সৃষ্ট বলে দোহাই দিলেও কিংবা ভাগ্যের পরিহাসের কথা বললেও এই সীমানা মানুষের দ্বারাই নির্মিত হয়। সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক শোষণ-শাসনের দুষ্টায়নের ফলে সাম্য আর ন্যায় থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়। চারদিকে দুষ্টদের দুষ্টচক্রে মিথ্যা এবং অন্যায়ের উল্লাস আর সত্য ও ন্যায়ের অকাল অপমৃত্যু ঘটে। তবুও মানুষ আশা ছাড়ে না, প্রতিক্ষা ও প্রার্থনা করেন শুদ্ধতা ও ন্যায়ের জন্য-

কাকসমাবেশে
কা-কা রবে দিশেহারা পাখিদের দল
কাকের ষড়যন্ত্রে নাকাল কোকিল
বসন্তের প্রতিক্ষা করে। (অসীম সীমানায়; পৃষ্ঠা ৬২)

কবি তাঁর কবিতায় বরাবরেই ন্যায়ের কথা বলেছেন, শান্তির কথা বলেছেন। কবি যোগ্য ব্যক্তির যোগ্য আসন কামনা করেন। একটি পরিশুদ্ধ মহৎ হৃদয়ের কামনা করেন-

শাসন-আসনে আসীন হোক মহৎ হৃদয়
অন্ধকার দূরে যাক হোক সূর্যোদয়। (শান্তির অগ্নিশিখা; পৃষ্ঠা ১৭)

কবি তাঁর প্রেম প্রীতি দুঃখ আনন্দবোধ বা সন্তসম ধ্যানে মানুষের শুভবোধকে দেখার চোখ এবং তাঁর চারিদিকের মানুষজনের হৃদয়ের জন্য জ্ঞানের আলোর প্রার্থনা করেন-

কপোট হৃদয় হতে দূর হোক কালো
সুন্দর দেখাবার চোখে দাও আলো। (সূর্যকে ডেকে এনে; পৃষ্ঠা ৫৫)

আলোচ্য গ্রন্থে লেখক ভাব বা বিষয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি কবিতার আঙ্গিক, ছন্দ, অন্ত্যমিল-অনুপ্রাস, পর্ব-পঙক্তি-স্তবক বিন্যাস, এমনকি কবির ব্যবহৃত চিত্রকল্প-উপমাগুলো অনুধাবন করলে আমরা পাঠক হিসেবে আলোড়িত হই, আনন্দিত হই, বিস্মিত হই, বেদনাহত হই, অভিভূত হই, ঋদ্ধ হই। এখনো পড়তে বসলে কবির কোনো কোনো কবিতায় কাঁচা রক্তের দাগ পাওয়া যায়, কোনো কোনো কবিতায় বিশুদ্ধ গোলাপের গন্ধ পাই, কোনো কবিতায় জীবন ও মৃত্যু এসে উঁকি দেয় অসীম সীমানায়। সব মিলিয়ে কবিতাগুলো আমাদের জীবন ও অসীমকে জুড়ে দেয় অসংখ্য বোধ আর অনুভবের সুতোয়। এ যেন এক মননশীলতার শুদ্ধতম প্রকাশ। কবির এই শুদ্ধতম ভাবনা ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি মানুষের শুদ্ধ হৃদয়ে। সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্ব অসীম সীমানাকে ভেদ করে হোক সুন্দর, শান্তিময়, সাম্যময় ও কল্যাণময়।

অসীম সীমানায়
সুবাস রায়
প্রচ্ছদ: সাধন বাবলা
প্রকাশকাল: মার্চ ২০১৮
প্রকাশক: আইডিয়া প্রকাশন রংপুর, বাংলাদেশ।

Share Button

আপনার মতামত দিন