অসুস্থতা থেকে এই-মাত্র” : প্রতিটি সৃষ্টি শেষের কথন

শনিবার, নভেম্বর ৪, ২০১৭ ১০:৫৫ অপরাহ্ণ
Share Button
  • মাহমুদ নোমান

নিজের ভেতর অন্তর্লীন আলোকছটা আর অন্ধকারে আভাসিত হয়ে ওঠা এক ধরনের বোধ যা অনির্দিষ্ট রুপরেখায় একটি ছায়া অথবা মায়া গলাগলি করে আছে প্রতিটি কবিতায়। প্রাত্যহিক জীবনপ্রবাহের অলি গলির বিষয়াদি ইতিহাস- আশ্রিত, মিথ ও পুরাণের ব্যবহারে নিজস্বতায় অনন্য মহীবুল আজিজের দিনলিপি যেন ‘অসুস্থতা থেকে এই-মাত্র’কাব্যগ্রন্থটি।
দিনলিপির খোঁচা দিয়ে এটিকে আবার ঠেলা মেরে ফেলে দেবার নয়, হয়তো এটি খুব কম সময়ে লেখা অর্থ্যাৎ এক মাসে। নয়তো নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কি নেই এ কাব্যগ্রন্থে! অথচ,কবিতার নতুনত্বের আবিষ্কারকের তকমা দিয়ে দিবেন পাঠশেষে- সবই নিম্নগামী, সব যায় নিম্নের দিকে মাধ্যাকর্ষণ নিয়মে। জল যায়,আপেল ফল যায়, মৃত মানুষেরা যায়। আরও যত স্থির কিংবা অস্থির ধারা,সকলকে যেতে হয় নিম্নগামিতায়।কেবল বিহঙ্গ সঙ্গীত। পাখিরা প্রথম বিদ্রোহী। মাধ্যকর্ষণের বিপরীতে
গিয়েছিল। ফলে বেলুন ও বিমানও যায় দেখাদেখি।
( সবই নিম্নগামী ;৯পৃষ্টা)

উপরোক্ত কবিতাংশে, কাব্যিকতার সাবলীল বোধে সহজাত ঢঙে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় চমকপ্রদ উপস্থাপনে পাঠক নিজেকে দোষারোপ করবে-এতোদিন কবিতা বিমূখ ছিলাম কেনো? অথচ,পাঠকের দোষ পুরোপুরি নয়।যারা কৃত্রিম লাইটে কাব্যপ্রতিভা বিলিয়েছিল তারা পাঠককে ঠকিয়েছে।এদিকওদিক থেকে একেকটা লাইন টেনেটুনে পাথরের মতো শক্ত শব্দাবলীর কবিতায় ছিল না রস-কষ,প্রাণ বা নতুনত্ব। আর এখানে নিভৃতচারী বলতে কাউকে বললে আমার যতো সন্দেহ ও আপত্তি, এতে শিল্প ও শিল্পী দুটোই হেনস্থা হয়েছে শিল্পবিক্রেতার কাছে। ভুলে যায় শিল্পীরাও মানুষ, মানুষদের মতো ওদের সবকিছু প্রয়োজন।এখানে মহীবুল আজীজের কবিতাগুলো নতুনভাবে বাধ্য করে যে, নিত্যদিনের সম্পর্কগুলো কবিতার শৈল্পিকতায় কী দারুণ মহৎ কবিতা হয়ে উঠেছে….
যদি না-ই আসে, মিছেমিছি ডেকে কী লাভ, ডাকার শ্রম আছে,/
শ্রমের মর্যাদা সবাই বোঝে না। না আসার নানা কারণ ও/
অজুহাত থাকতে পারে-কাজ,ব্যস্ততা কিংবা অবসরের ব্যস্ততা।
(যদি না-ই আসে;১৪ পৃষ্টা)

খ. যখন প্রথম দেশে ম্যাক্সি এসেছিল
জানতো না পাড়াগাঁ’র মেয়ে-মানুষেরা-
কারুরই মাথায় ঢোকে নি তা রাত্রিবাস
কিনা।পরে ঢ্যাং-ঢ্যাং পথে হেঁটেছিলো।
(যখন প্রথম দেশে;১৫পৃষ্টা)

মহীবুল আজিজ এ কাব্যগ্রন্থে শব্দঋণে ও ভাবে আধুনিকতার মানসিকতায় তৎপর হলেও আবহমান বাংলার মাটির তলে প্রোথিত ভাবনার শেকড়,তা লুকাতে পারেনি।হয়তো নিজেকে ছাড়িয়ে তোলার প্রচেষ্টা যদিও তবে সচেতনে বা অবচতনে কিংবা অস্তিত্ববাদে শেকড়ের শ্লোক আওড়ানো চমৎকারভাবে তা কাব্য পাঠকের হৃদয় আলোড়িত করে-
লবণ উত্তোলনের দৃশ্যে পরাজিত আমার সমুদ্র-বিলাস
সুস্বাদ খাবারও হেরে গেল শুধু এক চিমটে লবণের কাছে।
(লবণ উত্তোলনের দৃশ্যে;১৯পৃষ্টা)

০২.
মিথ পুরাণ মানুষের সামূহিক চৈতন্যের প্রত্ন কাঁচামাল। বিখ্যাত মিথ-ব্যাখ্যাতা জোসেফ ক্যাম্পবেল বলে,”মানবজীবনের আত্মিক সম্ভাবনার সংকেত চাবি হলো মিথ।”
মিথ পুরাণের ভাবনা মানুষকে করে তোলে অন্তর্মুখী,অন্তর্দ্বন্দ্বে নিপতিত হৃদয়ে শক্তি জাগরূক, নিয়ে যায় লাখো বছরের অভিজ্ঞতার ভান্ডারে।যেখানে জীবনের যে অর্থ ও প্রয়োজনীয় রসদ শতধারায় প্রকাশিত। মহীবুল আজিজের এ কাব্যগ্রন্থে সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞার জাদুস্পর্শে সংরক্ত সমকালীন ব্যাপারে অন্তর্জাল বুণন করে, অতীত-ঐতিহ্য অপরূপে পুনর্জীবিত। মিথ পুরাণ যেন মানুষের অবচেতনে রক্তে রক্তে সঞ্চালিত- লালিত গায়েবি ধন।এ ধনকে বুকে নিয়ে জ্ঞানাবেগ,তত্ত্বাবেগ ও হৃদয়াবেগের পরমার্থে মহীবুল আজিজের কবিতাগুলো একেকটি সুসজ্জিত সুষম রূপায়িত পরাবাস্তববাদীর কবিতার সাম্রাজ্য।
ক. পোশাকই সব, একথা কিছু বুঝেছিলেন শেখ সাদি
কিছু নাপোলিঁও বেনাপার্ত।
যুদ্ধজয়ের উচ্চতা আর জুতো-শিরোস্ত্রাণ মিলে
বোনাপার্ত কতখানি উচুঁ হন সেকথা,
খ. পোশাকই সব তা আরও জানা যায়
বারবণিতাদের ঠোঁটে দেখে পোশাকি ঢং
প্যারিস শহরে যারা অঙ্গ ঢাকে বাঘের চামড়ায়।

আজ আর এসব বলে কী ফায়দা!
তুমি ইতিহাসস্নাতক,তুমি….
(পোশাকই সব;১৮পৃষ্টা)

এ কাব্যগ্রন্থে মিথ -পুরাণ -ঐতিহ্য অনুষঙ্গ, প্রাত্যহিক জীবনাচরণের সাবলীল প্রকাশে পরাবাস্তবতার বিভ্রমের মধ্যে দিয়ে এক জাল বা কবিতা শরীর গঠিত হয়েছে।যা একেবারে মেদহীন, ঝরঝরে।পাঠকের বিরক্তি জাগবে না,বরঞ্চ উপমার গাম্ভীর্যে মনের পর্দা হয়ে উঠবে স্বচ্ছ আয়না।এখানে প্রকৃত কবিতা ফুয়ুজাত প্রাপ্ত হয়,পাঠকের নানাবিধ খোরাক মিটে-

আবেগ সম্ভবত নরম।সহজে জল হয়ে বেরিয়ে আসে।
জন্ম হলে,ভালবাসা হলে,মৃত্যু হলে এমনকি বিবাহ হলে,
তারপরে অ-বিবাহ হলেও আবেগ নানা রকমে দেখা দেয়।
(আবেগ সম্ভবত নরম;২১পৃষ্টা)

ক.দেয়ালে রয়েছে দালি,সামনে বাংলার নারীরা।
ওরা আলো-অন্ধকার আঁকে রেমব্রান্টের চেয়ে ভালো।
রূপালি শিল্ড পেয়েছে কোপেনহেগেন থেকে,
যদিও অঙ্কিত দেহে-লেস্ প্রিভিলেজ্ড্।
খ.ওরা দোভাষীটি ভাল পেয়েছিল,
‘অন্ধ’শব্দকে কীভাবে অন্ধকারে ছুঁড়ে দেওয়া যায়
কৌশল জানতো তার।
দেয়ালে রয়েছে দালি;২২পৃষ্টা)

০৩.

আধুনিক কবিতা আধুনিক হলো পরাবাস্তবতায়।পরাবাস্তবতা মানে ঠেস্ মারা কথা,ঝিকে মেরে বউ কে শেখানোর মতো।এখানে কবিতার বাঁকবদল,আধুনিক কবিতার পুরোপুরি জৌলুস যে যার থেকে বেশি পরাবাস্তবতার নান্দনিকতায় স্বতন্ত্র হয়ে উঠে।তাতে,কবি এক ভাবনায় কবিতা লিখলে,পাঠকরা নিজের ভাবনায় নিজের মতো করে নিয়ে এটার রস্বাদন করছে নানা রকমে।এখানে আধুনিক কবিতার জয়গান,তৃপ্তির ঢেঁকুর পড়ে–

ক.দেখে দুঃখিত ডলার বলে,ডানা থাকলেই চলে না-
ডানার আড়ালে থাকা চাই চর্বির তেল বা তেলের চর্বি,
টাকা হতে চেয়েছিল ;২৮পৃষ্টা)
খ. বলেছিলে,তোমার ঠিকানা খুব সোজা,যে-কেউ চিনতে পারে,
একদিকে মাঠ,একদিকে বট,কাছেই বেকারি আর পাশেই সেলুন-
রাস্তা থেকে জানালা দেখা যায়।
বলেছিলে,তোমার ঠিকানা;২৯পৃষ্টা)

সমকালীন কবিতার শেষে নৈঃসঙ্গতা কিংবা প্রশান্তি কবিতাকে নতুনত্ব দিয়েছে বরঞ্চ নতুন মোজেজা। এসব মহীবুল আজিজের কবিতায় মায়ার বন্ধনে গলাগলি করে আছে।

চিত্রকল্পসর্বস্ব ভারে ন্যুজ না, অথচ কী পরিমিতি উপমায়ও কবিতার নতুন ফর্ম তৈরি করেছে।তবে মহামান্বিত ভাবে ও বোধে শক্তিশালী কবির ছন্দ নিয়ে খেলার আশা পাঠকমাত্র করতে পারে।অথচ, একটি কবিতায় শুধু মার্কিনমুলুকের নাক গলানি দারুণ বিন্যস্ত—
ধান দেখতে-দেখতে ওরা ধান সংগ্রহ করে-
বাংলার ধান,যা জেগে আছে আবহমানকাল থেকে।
অতঃপর নির্বাচিত ধান চলে যায় দূর মার্কিন দেশে,
বহু গবেষণা-শেষে তারা ফেরে আরও শক্তি নিয়ে-
নতুন-নতুন নামে,হাইব্রিড মানে অধিক ধানবন্ত হয়ে।যথা,
যুযুধান,প্রণিধান,বিধান-প্রতিবিধান
ব্যবধান,অবধান,সন্ধান
অভিধান,সমাধান…

ধান দেখবে বলে;৩৭পৃষ্টা)

মহীবুল আজিজ এ কাব্যে কবিতার পর কবিতায় গেঁথে দিয়েছেন নৈঃসঙ্গ্য ও একাকিত্বের জ্বলন ও যন্ত্রণাবোধ,কিন্তু এ নির্জনতা বা নিঃসঙ্গতা চূড়ান্ত নয়।কবির প্রজ্ঞাময় চৈতন্যে প্রতিভাত জীবনের অসীম সম্ভবপরতা,স্বপ্নময়তা।তবে,মহীবুল আজিজ এ কাব্যে জাতিক ও আন্তর্জাতিক যে -সমবায়ী তরঙ্গ প্রবাহিত করেছেন,এজন্য কবিতা নির্মাণের দিকেও দৃষ্টি দিতে হয়েছে অনিবার্যভাবেই।এতে প্রকরণ -বিষয়েও তার বিচিত্র গামিতা এ অল্প সময়ে নান্দনিকতার ফসল”অসুস্থতা থেকে এ-মাত্র”কাব্যগ্রন্থটি।এ অসুস্থতা সৃষ্টিশীলতার ও প্রেমেজর্জর আত্মার।
এতকিছুর পরও একজন কবি তার সমসাময়িকতা এড়িয়ে যেতে পারেনা।আস্থা ও অস্তিত্বের সংকটে সমসাময়িক বিষয়ও কবিকে করেছে আঘাতের পর আঘাত,তাই বলে উঠে–
কতখানি জল ধরে করপুটে
এখন শোকের সময় নয়
এ-জলে আগুন নেভে না মোটে,
নগর এড়িয়ে পোড়ে দেবালয়।
কতখানি জল ধরে;৪৪ পৃষ্টা)

কবি যেন লালিত কষ্টের গোলাঘর।কষ্ট বয়ে বেড়াবার জাজ্বল্য প্রতিশ্রুতি,এভাবে কবিদের সৃষ্টি মহিমাময় বরঞ্চ কোন কোন পাঠকের নিজেদের কথা হয়ে যায়।যখন কবি বলে—
তিনটি নক্ষত্রের পথ ধরে-ধরে,হেঁটে,জিরিয়ে -ঘুমিয়ে,
ফের হাঁটছি- হাঁটবো-ই।
না হয় আমার দেখা হবে প্রত্যাখানের সঙ্গেই।
তুমি যেদিকেই;৪৬পৃষ্টা)
প্রেমিক হৃদয় কখনো প্রত্যাখানের শব্দটিও মনে রাখতে চায়না সত্যিই।প্রেমিকরা সৃষ্টিতে মশগুল থাকে সবসময়। এ কাব্যগ্রন্থে মহীবুল আজিজ কে আমার কাছে কবিতার প্রেমিক মনে হয়েছে,তাতে অনবদ্য হয়েছে বাক্যের পর বাক্য,সত্যিকারে প্রেমিকের মতো ভাষা-বিষয়ে কারো ধার তেমন ধরেনি।এখানে এ কাব্যগ্রন্থের পুরোপুরি স্বার্থকতা,তা কবি কবিতায় বলে দিয়েছে–

অসুস্থতা থেকে এই-মাত্র ফিরে এসেছি।

তার মানে এখনই মরবো না,আরও কিছুক্ষণ
বাগানের ধার দিয়ে হেঁটে আসা যাবে।
হ্যাঁ,বাগানের ধার দিয়েই তো,মাঝখানে নয়-
কারণ বাগানকে মনে হয় এক নিঃসঙ্গ কবর।
অসুস্থতা থেকে এই-মাত্র;৪৮পৃষ্টা)

এই কাব্যগ্রন্থ পাঠশেষে,আমার মধ্যেও জ্বলন-পীড়ন শুরু হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।চোখের কোণা লাল হয়েছে,এ অসুস্থতা বুঝি-শিল্পের। পাঠকের এ অসুস্থতা কবিও চায় আর এ চাওয়া করতেই পারে।

Share Button