ঋণ।। চিন্ময় মহান্তী

রবিবার, নভেম্বর ২৬, ২০১৭ ৬:০৪ অপরাহ্ণ
Share Button

 

 

পূর্ব আকাশে সূর্য সবেমাত্র দৃশ্যমান হইয়াছে , তাহাকে কর্মকারের হাপরের হাওয়ায় গনগনে আঁচে রাঙা লৌহ চক্রের ন্যায় দেখাইতেছে। স্রোতস্বিনীর শীতল জলে স্নান সমাপনান্তের হাওয়া আসিয়া , গ্রাম্য সকল জীবের অস্থি কাঁপুনির উৎপাত বাড়াইয়া দিয়াছে । অদূরে কয়েকজন বৃদ্ধ শুষ্ক কাষ্ঠ জ্বালাইয়া, বৃত্তাকারে বসিয়া দেহগুলি সেঁকিয়া লইতেছেন । গৃহের সদরে গোবর লেপন সমাপন করিয়া, দুই চারিটি বধূ কক্ষে কলসি লইয়া গ্রাম মধ্যস্থিত ইঁদারার সন্মুখে ভিড় করিয়া খোশ গল্পে মজিয়াছে, তাহাদের দেখিয়া মনে হইতেছে, বহুকাল পর তাহাদের সাক্ষাৎ ঘটিয়াছে ।

হরেন রাত্রে শুইতে যাইবার পূর্বে একটি বিড়ি ধরাইয়া অর্ধেকটি পান করিয়া, আবিষ্টাংশটি রাখিয়া দিয়াছিলেন, এক্ষনে সেই পোড়া বিড়িটি ধরাইয়া টানিতেছিলেন । তাহারেই একাদশ শ্রেণীতে পাঠরত পুত্র সরাসরি পিতাকে কিছু বলিতে না পারিয়া, পিতাকে শুনাইতে বই খুলিয়া পড়িতে ছিল,” ধুমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, ইহা ক্যান্সার রোগের কারণ।”  পিতা পুত্রের পাঠের প্রতি কর্ণপাত না করিয়া কি যেন ভাবিতেছিলেন ।

এমত সময় বদন আসিয়া হাজির হইল । সে এইরূপ ভাবিয়া আসিয়াছে যে দিন দুপুরে হরেন কাজের উদ্যেশ্যে বাহির হইয়া যাইবেন , এক্ষনে যাইলে তাহার সহিত দেখা হইবে । আসিয়াই কোনপ্রকার অপ্রাসঙ্গিক কথা না বলিয়া, সোজা প্রসঙ্গ লইয়া বলিল, “বলি খুড়ো ,অনেক দিনতো হলো এবার ধারের টাকাটা মিটিয়ে দাও ।”

বর্ষাকালীন ধান চাষের সময় হরেন , বদনের নিকট কিছু টাকা ধার লইয়াছিলেন। টাকা চাহিতে গিয়া জানিতে পারিয়াছিলেন, বদনের পিতা উপযুক্ত পুত্র বদনকে সমস্ত সম্পত্তি বুঝাইয়া অবসর লইয়াছেন । বদনের পিতার যখন ধানের ব্যবসা ছিল ,হরেন মজুরের কাজ করিয়াছিলেন, বদন তখন সবেমাত্র হামাগুড়ি দিতে শিখিয়াছিল । কখনো কখনো একটানা কাঁদিতে থাকিলে মাঠাকরুন বলিতেন ,”বাবা হরেন, যাওতো পাগলটাকে একটু নদীর চরে ঘুরিয়ে নিয়ে এসো ।”  হরেন তাহাকে কোলে করিয়া নদীর চরে ঘুরাইতে ঘুরাইতে বিপুল আবদার সহ্য করিয়াছেন । পুত্রসম বদনের নিকট টাকা চাহিতে ইতস্তত হইয়াছিলেন । মানুষ যখন নিরুপায় হইয়া থাকে তখন বহু কিছু ইচ্ছার বাহিরে গিয়াও করিতে হয় । হরেনও বাধ্য হইয়া বদনের নিকট ধার লইয়াছিলেন । বদন সেই টাকারই তাগাদা করিতে আসিয়াছে ।

হরেন বদনের মুখপ্রতি চাহিয়া বলিলেন ,” দেবো বাবা ।”

—” কবে দেবে খুড়ো , ধান সব গোপনে গোপনে বিক্রি করে দিলে ।”

—” যত তাড়াতাড়ি পারি দিয়ে দেবো ।”

—” তাই যেন হয়, আমি কিন্তু বার বার আসতে পারব না ।”

এই বলিয়া বদন হন্ হন্ করিয়া নদীর অভিমুখে চলিয়া গেল । হরেন ভাবিলেন অর্থের নিকট মানুষের স্নেহ, মায়া, মমতার কোনো মূল্য নাই; অর্থের পশ্চাতে লালায়িত হইয়া ছুটিতে ছুটিতে সেই দিনের হাস্যোৎফুল্য শিশুটি আজ কঠিন  পাষাণে পরিণত হইয়াছে ।

হঠাৎ হরেনের নজর হইল, তাহার পুত্র পড়া থামাইয়া তাহার প্রতি চাহিয়া রহিয়াছে । হরেন হাত হইতে নিভিয়া যাওয়া বিড়িটি ফেলিয়া ঘরে ঢুকিয়া গেলেন ।

 

ঘরের পূর্ব দিকের দেওয়াল ঘেঁসিয়া বাবুই দড়ি ছায়িত খাটিয়া রহিয়াছিল । তাহাতে শুইয়া হরেন, বদনের কথার তিক্ষ্ণতা লইয়া ভাবিতেছিলেন । তিনি যাহাকে কোলেপিঠে করিয়া মানুষ করিয়াছেন, তাহার কথাই তাহাকে একদিন বিদ্ধ করিবে, সেই একদিন তাহাকে শাসাইয়া যাইবে, ইহা কিরূপে সম্ভব হইয়াছে ; তাহার কোনো সদুত্তর পাইতেছিলেন না । অবশেষে সমাধান সূত্র পাইলেন, মনিবের উত্তরসূরীকে আদর দিয়া লালনপালন করিয়া বড় করিয়া তুলিলেও সে মনিবই হইয়া থাকে, এস্থলে পালনকারীর কোনোরূপ পরিবর্তন হয় না । পঙ্কিল হইতে লালিত পালিত হইয়া কমল ফুটিয়া উঠিলে সে কমলই রয়, পঙ্কিল পঙ্কিলই রহিয়া যায় ।

 

একটু বেলা হইতেই, কাহাকেও কিছু না বলিয়া হরেন বাহির হইয়া গেলেন । নিকটবর্তী শহরের এক পুর্বপরিচিত ব্যবসায়ীর নিকট গিয়া তাহার যাহা কিছু গৃহ সম্পত্তি রহিয়াছে তাহার বিবরণ দিয়া জানিতে চাহিলেন, ”এগুলো বন্ধক দিলে পাঁচ হাজার টাকা হবে কি বিমল ।”

বিমল একটি গণক যন্ত্র বাহির করিয়া , অতীব যত্নের সহিত হিসাব করিয়া বলিলেন, “না হবে না , খুব জোর হলে তিন হাজার টাকা হবে।”

হরেনের গৃহ সম্পত্তি বলিতে কয়েকটি কাঁসার থালা, পেতলের ঘটি, কলসী ও চাষের কার্যে ব্যবহার্য কয়েকটি কোদাল, কাস্তে রহিয়াছে।

বিমল সদয় হইয়া কহিলেন, ” হরেন তোমার চাষের জমি বিক্রি অথবা বন্ধক রাখলে টাকাটা হয়ে যাবে।” কথাটা শুনিয়া হরেন নির্বাক হইয়া গেলেন। তাহাকে দেখিয়া মনে হইতে লাগিল, যেন হঠাৎ করিয়া একটা প্রকান্ড ঝড় আসিয়া তাহার অস্তিত্ব মুছিয়া দিয়া গেল।

মনে মনে ভাবিলেন, তাহার অনেক কষ্টে ক্রয় করা মাত্র এক বিঘা জমি হইতে তাহার একমাত্র পুত্রকে বঞ্চিত করিয়া, একবক্ষ বিবেক দংশণ লইয়া বাঁচিতে পারিবেন না। বন্ধক রাখিয়া যে কোন প্রকারে ছাড়াইবেন, তাহা ভাবিয়া পাইলেন না । বিমলের সহিত আর কোন বাক্যালাপ না করিয়া উঠিয়া পড়িলেন।

ঘরে যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন তাহার পুত্র একটি কাঁসার সানকিতে করিয়া ভাত খাইতেছিল। হরেন তাহার প্রতি চাহিয়া ভাবিলেন, আজ তাহার একমাত্র পুত্রকে বাঁচাইতে গিয়া বদনের নিকট ঋণী হইয়া পড়িয়াছেন, সেইদিন যদি তাহার পুত্রের কলেরা না হইত, তাহা হইলে তাহার ধান বিক্রি করিয়া প্রাপ্ত টাকাগুলি জলের ন্যায় বাহির হইত না, তিনি বদনের মুখের উপর ছুঁড়িয়া মারিতেন। তিনি এই ভাবিয়া সন্তুষ্ট হইলেন যে, তিনি ঋণী হইয়াও তাহার একমাত্র বংশপ্রদীপটিকে জ্বালাইয়া রাখিয়াছেন। বিধাতা কখনো কাহাকেও সকল দিক হইতে সুখী করিয়া থাকেন না, হরেনকেও করেন নাই। তাহার পুত্রটিকে জটিল রোগ হইতে ফিরাইয়া দিয়া সুখ দিয়াছেন ঠিকই কিন্তু ঋণের বোঝা চাপাইয়া দুঃখ দিয়া রাখিয়াছেন।

হরেন রন্ধনশালায় ঢুকিয়া দেখিলেন, তাহার স্ত্রী রমা, স্নানে গিয়া পুকুর হইতে যে সুস্নি শাকগুলি লইয়া আসিয়াছেন, সেইগুলি বটি লইয়া কুচাইতেছেন। হরেন গলাটা অল্প খাঁকরাইয়া লইয়া বলিলেন, “আজ সকালে তুমি যখন ইঁদারায় গিয়েছিলে বদন এসেছিল, খুব কড়া ভাষায় টাকাটা চেয়েছে।”

বটি হইতে দৃষ্টি তুলিয়া রমা হরেনের প্রতি চাহিয়া বলিলেন,  “তুমি কোথায় গিয়েছিলে ?”

শহরে গিয়া বিমলের সহিত যাহা কথা হইয়াছে সমস্ত খুঁটিনাটি হরেন বলিলেন। রমা এতক্ষন কিছু বলেন নাই, সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া রাগিয়া বলিলেন, “সব বন্ধক দিয়ে দিলে মাটিতে গর্ত করে ভাত খাবো নাকি !” হরেন শুনিয়া মনে ব্যাথা পাইলেন, কিন্তু কিছুই বলিলেন না ।

দুঃখের দিনে আপন অর্ধাঙ্গিনীও যে তাহা মানিয়া লইয়া পাশে দাঁড়াইয়া ভগ্ন হৃদয়ে সাহস না যোগাইয়া, হৃদয়কে আবারও বেশি ভাঙিয়া দেন; হরেন তাহা আজ মনে প্রাণে উপলব্ধি করিতে পারিলেন । এই জগতে সকল জীবই সুখ পিয়াসী, বিন্দুমাত্র অ-সুখ আসিলেই তাহারা পোষণ কর্তাকে ছিঁড়িয়া খাইতে চাহে ।

 

বিপদের দিনে, যাহাকে আপন বলিয়া ভাবা হয় সে যদি সরিয়া যায়, তাহা হইলে অন্তরে যে ব্যাথা হয়; তাহা যেকোনো দেহজ ব্যাথাকে হার মানাইয়া দেয়। হরেন রন্ধনশালা হইতে বাহিরে আসিয়া, পুত্র যেস্থলে খাইতেছিল তথায় মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল। তাহার মনে পড়িতে লাগিল, আদিকাব্য রামায়ণের রচয়িতা মহর্ষি বাল্মীকির কথা, তিনি যখন দস্যু রত্নাকর থাকিয়া ডাকাতি করিয়া পাপ করিতেন, তাহার পাপের ভাগ স্ত্রী ও মাতা কেহই লইতে চাহেন নাই, অথচ তাহার রোজগারে জীবন নির্বাহ করিয়াছেন। সেও সেইরূপ ঋণ করিয়া মহাপাপ করিয়াছে, স্ত্রী সেই পাপের ভাগ লইতে আজ রাজি নহেন ।

রন্ধনশালা হইতে রত্না উচ্চস্বরে বলিলেন, “স্নান করে এসো।” হরেন একটি বাটিতে করিয়া সরিষার তৈল লইলেন, উঠানে কাপড় শুকাইবার জন্য যে দড়িটি টাঙ্গাইয়া রাখা হইয়াছিল তাহা হইতে অর্ধ শুষ্ক গামছাটি টানিয়া লইয়া, কাঁধের উপর ফেলিয়া স্নানের উদ্দেশ্যে নদীর অভিমুখে চলিলেন।

আজ তাহাকে একটু ঘুর পথে নদীতে আসিতে হইল। তিনি যখন গ্রামবাসীর সচরাচর ব্যবহৃত পথ ধরিয়া আসিতেছিলেন তখন বিপরীত দিক হইতে বদন আসিতেছিল। বাঘের মুখে পড়িলে শিকার যেরূপ ছুটিয়া নিজেকে গোপন করিয়া থাকে, হরেনও সেইমত ব্যাঘ্রের মুখ হইতে নিজেকে গোপন করিয়াছেন।

 

একই গ্রামে বাস করিয়া কত দিন আর লুকাইয়া থাকা যায়, একদিন না একদিন সম্মুখীন হইতেই হয়। হরেন সেইদিন কোথা হইতে ফিরিতেছিলেন, অকস্মাৎ বদনের মুখোমুখি পড়িয়া গেলেন। বদন বিস্তর তাচ্ছিল্যের সুরে বলিল, “কি খুড়ো, দেবো দেবো করে তো একমাস পার করে দিলে, বলি এবার টাকাটা হেঁকে দেবে নাকি?!”

হরেন ভীষণ লজ্জিত বোধ করিয়া অবনত মস্তক হইয়া বলিলেন, “আর দিন কয়েক সময় দাও বাবা।” আজ একমাস ধরিয়া চিন্তিয়া হরেন কোনও টাকা জোগাড় করিতে পারেন নাই, তাহার সুদিনে যাহাদের দুর্দিনে টাকা ধার দিয়া সহায়তা করিয়াছিলেন, তাহাদের আজ সুদিন হইলেও তাহার দুর্দিনে টাকা ধার দেয় নাই। তাহাদের এই আচরণ দেখিয়া হরেন মনে মনে ভাবিয়াছেন, মানুষ আজ বড়ই নির্দয় হইয়া উঠিয়াছে। ভাবিয়া কোনও প্রকার লাভ করিতে পারেন নাই, শুধুমাত্র মনে প্রাণে দগ্ধ হইয়াছেন ।

 

একটি পুত্রসম যুবকের নিকট হইতে আর অপমান সহ্য করিতে না পারিয়া হরেন শহরে চলিয়া গেলেন। ডাক্তারের সহিত পরামর্শ করিয়া আপন রক্ত বিক্রয় করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। তাহার এ নেগেটিভ রক্ত হইবার কারণে চাহিদা রহিয়াছে। ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসাধীন এক বিত্তবানের মাতার অনুরূপ বিভাগের রক্তের প্রয়োজন পড়িয়াছিল, তিনি আসেপাশে কাহাকেও খুঁজিয়া পান নাই। হরেন তাহার সহিত পরিচিত হইয়া, মোটা টাকা হাতে লইয়া রক্ত দিলেন। ইতি পূর্বে হরেন কখনো কাহাকেও রক্ত দেন নাই, তিনি অসুস্থতা বোধ করিলেন, মাথা ঘুরিতে লাগিল, জ্বর আসিল। অবস্থা দেখিয়া বিত্তবান ব্যক্তিটি বুঝিলেন, ইনি নিশ্চই কোনো বিপদে পড়িয়া রক্ত বিক্রয় করিয়াছেন। তিনি উপযাচক হইয়া জানিতে চাহিলেন, “আপনি কেন রক্ত বিক্রি করতে চাইলেন?” হরেন আর কিছু লুকাইলেন না, সমস্ত ঘটনা তাহাকে বলিলেন। শুনিয়া ব্যক্তিটি বলিলেন, “ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য, আপনি রক্ত বিকতে না এলে আমার মা বাঁচতেন না, আপনার কোনও চিন্তা নাই আমি আপনার ছেলের মতো, আমি তো রয়েছি । ”কথাটি শুনিয়া হরেনের আনন্দ অশ্রু দুই পল্লবকে ভিজাইয়া দিল। ব্যক্তিটি হরেন কে নার্সিংহোমে ভর্তি করিয়া দিলেন। দুই দিন পর হরেন সুস্থ হইলেন। ব্যক্তিটি তাহার সমস্ত বিল মিটাইয়া নিজ নাম ঠিকানা লেখা একটি কার্ড তাহাকে দিয়া বলিলেন, “কখনো কোনও প্রয়োজন হলে আসবেন। “হরেন তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া, আপন গৃহ অভিমুখে রওনা হইলেন। যাইতে যাইতে ভাবিলেন, ধনী হইলেও সকলে এখনো বদন হইয়া ওঠে নাই ।

 

হরেন যখন ঘরে ফিরিয়া আসিলেন দেখিলেন রত্না পুত্রটিকে কাছে লইয়া বসিয়া আছেন। দুইজনের মুখগুলি শুকাইয়া পাংশু হইয়া গিয়াছে। দুই রাত্রি যে তাহারা ঘুমায় নাই  তাহার পরিষ্কার চিত্র তাহাদের মুখে ফুটিয়া রহিয়াছে। স্বামীকে দেখিয়া রত্না কাঁদিয়া উঠিলেন, বলিলেন, “দু’দিন তুমি কোথায় ছিলে! সমস্ত আত্মীয় বাড়ি খুঁজেও পাই নি।” হরেন ব্যাপারটা এড়াইয়া গিয়া বলিলেন, “জল দাও।”

রত্না বুঝিলেন তিনি জবাব পাইবেন না, সেই কারনে আর কথা না বাড়াইয়া জল আনিতে চলিয়া গেলেন ।

 

অপরাহ্ণ হইয়াছে, হরেনের পথশ্রমের ক্লান্তি দুর হইয়াছে। তিনি টাকার থলেটি হাতে লইয়া, বদনের গৃহ পানে চলিলেন। ভাবিলেন টাকাটি দিয়া আজ ঋণ ভার হইতে মুক্ত হইবেন । বদনের গৃহে আসিয়া জানিতে পারিলেন, বদন তাহার কোলের পুত্রটিকে লইয়া, গ্রামের পাশদিয়া প্রবাহিত শিলাবতী নদীর জল দেখিতে গিয়াছে। আজ কাঁসাইয়ের বাঁধ হইতে জল ছাড়িয়াছে, সেই জল দুকূল ছাপাইয়া বহিতেছে ।

হরেন আসিয়া যখন বদনের সন্মুখীন হইলেন, দেখিলেন বদন তাহার পুত্রটিকে কোলে করিয়া জলের একেবারে নিকটে দাঁড়াইয়া, আঙ্গুল দিয়া জলস্রোতের প্রতি শিশুটির একাগ্রতা বাড়াইতেছে ।

হরেনের হাতের থলেটি দেখিয়া বদন বলিল, “কি খুড়ো টাকা এনেছো।”
হরেন বলিলেন ,” হ্যাঁ বাবা।”

বদন টাকা দেখিয়া এতটাই বিভোর হইল যে আপন পুত্রটিকে তথায় নামাইয়া, টাকাগুলি গুণিতে লাগিল। হরেন সেই গণনা দেখিতেছিলেন।

শিশুটি জলস্রোতের প্রতি একাগ্রতা বসত হামাগুড়ি দিয়া সেইদিকে চলিল। বদন তাহা নজর করিল না । অকস্মাৎ একটি ঝুপ করিয়া আওয়াজ উঠিল । বদন দেখিল হরেন জলে ঝাঁপাইয়া চিৎকার করিতেছেন, “বদন তাড়াতাড়ি দড়ি নিয়ে এসো।” বদন হতভম্ব হইয়া গৃহ অভিমুখে ছুটিল, খবর পাইয়া গ্রামের লোক ছুটিয়া আসিল। বদন বিদ্যুৎ গতিতে দড়ি লইয়া আসিল, দেখিল হরেন তাহার পুত্রটিকে একহাত দিয়া তুলিয়া রাখিয়া, অন্যহাতে স্রোতস্বিনীর প্রবল তোড়ের সহিত লড়াই করিতেছেন । দড়িটির প্রান্তে একখানি  পাথর বাঁধিয়া, বদন দড়িটি হরেনের প্রতি ছুড়িল , হরেন দড়ির প্রান্তে শিশুটিকে বাঁধিয়া দিয়া, নিজে দড়িটি ধরিয়া রহিলেন। পাড়ের জনতা তাহা টানিতে লাগিল। এই বয়সে এতক্ষন ধরিয়া প্রবল স্রোতের সহিত লড়াই করিয়া তাহার হাত অবশ হইয়া আসিয়াছিল, হঠাৎ তাহার হাত ফসকাইয়া গেল, তিনি বুঝিলেন আর নয় , চিৎকার করিয়া বলিলেন, ”ছেলেটাকে তাড়াতাড়ি টেনে তোলো ।”  তাহার পর তাহার আর কোনো আওয়াজ আসিল না , শুধু প্রবল জলস্রোতের মধ্যে একটি ঘূর্ণি দৃশ্যমান হইল।

সকলে যখন শিশুটিকে টানিয়া তুলিল , দেখিল সে জ্ঞান হারাইয়াছে। বদন পুত্রকে কোলে করিয়া ডাক্তারের নিকট ছুটিলেন। ডাক্তার শিশুটির উদর হইতে জল বাহির করিয়া তাহাকে সুস্থ করিয়া তুলিলেন।

বদন শিশুটিকে তাহার মাতার কোলে তুলিয়া দিয়া ঘরে ঢুকিল। শার্টের পকেট হইতে হরেনের ঋণ শোধকৃত টাকা গুলি বাহির করিয়া, সেইগুলির পানে চাহিয়া নির্বাক বসিয়া রহিল । তাহার চক্ষু ছলছল দেখাইতে লাগিল ।

Share Button