চিঠি।। সেবক বিশ্বাস

শুক্রবার, নভেম্বর ৩, ২০১৭ ৯:২০ অপরাহ্ণ
Share Button

 ­              ধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতা যখন রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় পৃথিবীকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে, জোনাকির মতো মিটমিট জ্বলা স্মৃতিকণাকে স্পর্শ করার জন্যে সময়ের মতো নিদ্রাহীন নিশিজাগা শ্রীশ সহসা মাকড়সার সুরক্ষায় থাকা ভুলে যাওয়া চিঠির ব্যাগ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি চিঠির খামেই যেন পুরোনো ফুলের গন্ধ। শ্রীশের দু’হাতে উঠে আসে মুঠো মুঠো অতীত। হঠাৎ একটি হলুদ খামে তার চোখ পড়তেই দাঁড়িয়ে পড়ে রাত; একটি শীতল হাওয়ায় কেঁপে ওঠে দেহমন। শ্রীশ দেখে প্রেরকের ঠিকানায় লেখা আছে

‘কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল,
রুম নং-৩৭(৩য় তলা),
বয়রা, খুলনা-৯০০০
ছেঁড়া খাম খুলে চিঠিটা তুলে নেয় দু’হাতে। উনিশ বছর আগে লেখা একটি হঠাৎ চিঠি! দ্বিতীয় রাত নেমে আসে অন্তরে। পথিক হেঁটে চলে হারানো পথে।
ড. রঙ্গলাল সেনের ক্লাস শেষ করে ছায়াহীন প্রখর রৌদ্রে শ্রীশ স্বপ্নময় ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে ফুটপাত দিয়ে পথ চলতে লাগলো। মনে পড়ে,বাবার কত আশা ছিল তার ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট হবে,ডাক্তার হবে,নয়তো ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে পিএইচডি করবে,মা তার রত্নগর্ভা হবে। কত কী!ভাবতে ভাবতে জগন্নাথ হলের গেট পেরিয়ে অক্টোবর স্মৃতিভবনের চার তলায় উঠে ৪৩৩ নম্বর রুমটি খুলতেই দেখতে পেলো ফ্লোরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটি হলুদ খাম। শ্রীশ নিচু হয়ে ডান হাতে খামটি তুলে নেয়। দেখে, প্রাপকে তার নাম।
শ্রীশের একটি বাতিক আছে,কোনো পত্রই পাওয়া মাত্রই সে পড়ে না। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সাধারণতঃ সে চিঠি পড়ে। আজ প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগায় ক্লাসের খাতা খাটের উপর রেখে খামটি পকেটে নিয়ে ক্যান্টিনে খেতে চলে যায়। খেতে খেতে খামের উপর বাঁ-পাশে লেখা স্থানটি অর্থাৎ কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল,বয়রায় কেউ চেনাজানা আছে কিনা,মনে করার বহু চেষ্টা করে। কিন্তু কারো কথাই সে ভেবে বের করতে পারে না। ‘না,আজ আর খাওয়া হবেনা,বন্ধু’। সহপাঠী শিমোনকে অবাক করে দিয়ে মাঝপথে খাওয়া শেষ করে শ্রীশ রুমে চলে এলো। খামটা খুলবে কি খুলবে না, ভাবতে ভাবতে অবশেষে জামাকাপড় ছেড়ে লুঙ্গি-গামছা হাতে বাথরুমে প্রবেশ করলো সে। মিনিট দশেক স্নান সেরে শুকনো পোশাক পরে বালিশে মাথা রাখে সে। কৌতুহলী মনে এরপর চার আঙুলের সাহায্যে ছিঁড়ে ফেলে খামটি। দাগটানা ডায়রির ছেঁড়া পাতার শেষে দেখে অপরিচিত এক নাম ‘ছোটবুড়ি’! চিঠিটা বারবার পড়েও সে রহস্যভেদ করতে পারলো না। অবাক বিস্ময়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে চিঠির উত্তর লিখলো সে,

“বোন,
তোমার পত্রখানা বহুবার পড়েছি। কিন্তু প্রকাশে লজ্জা সত্ত্বেও জানাচ্ছি যে, তোমাকে আমি চিনতে পারিনি। অথচ তোমার অন্তরে আমার পূজনীয় আসন জেনে বিস্ময়ে মাটির মূর্তি হয়ে গেছি। তোমার মাথায় হাত রাখতে না পারলেও খোলা বাতাসে আমার আশিস,আমার প্রার্থনাটুকু পাঠিয়ে দিলাম- নিশ্চয়ই তোমাকে ছুঁয়ে আসবে। চিরদিন সুখে থেকো।
-তোমার শ্রীশ দা।”

এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। বন্ধু ধ্যানাত্মা কৃষ্ণ সরকার গুণীন্দ্র গুণীর সঙ্গে তেমন আর টিএসসি,কলাভবন, দোয়েল চত্বর,পুরোনো রেসকোর্স, প্রিয় নজরুলের সমাধিতে সময় দেয় না শ্রীশ। একবার সহপাঠী উত্তম(নিজেকে প্রায়ই অধম বলে উল্লেখ করতো) সন্ধ্যায় শক্ত হাতে ধরলো তাকে- তার সাথে যেতেই হবে;শেলীর সাথে বাদাম খাওয়ার প্রোগাম আছে। বই বন্ধ রেখে তারা বেরিয়ে পড়লো রোকেয়া হলের উদ্দেশে। স্লিপ পাঠানো হলো শেলীকে। মধুর ক্যান্টিনে নাস্তা করার এক ফাঁকে শেলী শ্রীশকে বললো,
– তোমার রহস্য-বোনের খবর কী?
– অন্ধকারে এসে অন্ধকারেই মিলিয়ে গেছে।
উত্তম বললো-
রাখী দিবসে নিশ্চয়ই সে দাদার খবর নেবে।
-দেখা যাক, শ্রীশের উত্তরযোগ।
কফি হাউসের আড্ডা ভাঙলো একসময়। ইদানিং শ্রীশ আর টিউশনি করে না। সামনে অনার্স ফাইনাল। বড়দা তার খরচ চালান। তিনি কলেজ শিক্ষক। বাবার পরে বড়দার প্রতিই তার অগাধ শ্রদ্ধা-ভক্তি। পড়ালেখা নিয়ে বেশ ব্যস্ত শ্রীশ। তার মাঝেও একদিন হঠাৎ মা’র কথা মনে পড়ায় সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়ে সে। গাবতলি থেকে খুলনা সাধারণতঃ সে ঈগলে যাতায়াত করে। সেদিনও ঈগলের
যাত্রী হলো সে। খুলনার সোনাডাঙ্গায় যখন বাস থেকে নেমে রিক্সায় উঠলো, তখনো পথে কাকের ডানার মতো অন্ধকার। রিক্সা-ভ্যান ইত্যাদি যোগে সে যখন বাড়ি পৌঁছলো,ভোরের আলো তখনো শিরীষের ডালে পড়েনি। উঠোনে গোবর-ছড়ার শব্দ শুনতে শুনতে শ্রীশ ভিতরে ঢুকলো।
মা’কে প্রণাম করতেই স্নেহহাস্যে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মা বলে,
– মণি এসেছো। ভালো হয়েছে। ইন্দিরার বিয়ে। শ্রীশ আর কথা না বলে ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে স্নানাদি
সেরে ফ্রেস হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

ঘণ্টা তিনেক পর ঘুম ভাঙলে শ্রীশ দেখে খাবার হাতে মা বিছানার পাশে দাঁড়ানো। হাতমুখ ধুয়ে সে মায়ের পাশে বসে খেতে শুরু করে। এক ফাঁকে সে মায়ের কাছে জানতে চায়- মা, ইন্দিরা কে?
-তোর মামাতো বোন।
‘মামা’ শব্দটি শোনার সাথে সাথে শ্রীশের মনটা শেষ
বিকেলে ওড়া পাখির মতো উদাস হয়ে যায়। সেই কবে ছোটবেলায় মায়ের কোলে চড়ে মামার বাড়ি গিয়েছে, মনে করতে পারেনা। সম্বিৎ ফেরে মায়ের ডাকে।
– আর একটু দুধ দিই,বাবা”?
– আর দিও না,মা। ইন্দিরার কোথায় বিয়ে হচ্ছে?
– বিশাল বড়লোকের বাড়ি।
– অত বড়লোকের ছেলে তা ওখানে বিয়ে করছে কেন?
মামাদের অবস্থা বুঝি ফিরেছে?
– না। আসলে খুলনায় পড়তে পড়তে ঐ ছেলের সাথে নাকি দেখাসাক্ষাৎ। অনেকদিন ধরে ওদের পরিচয়। ছেলের মা-বাবা প্রথমে এ বিয়েতে নাকি রাজি ছিল না। এখন হঠাৎ রাজী হয়েছে।
– মামারা অত বড় ঘরে বিয়ে দিতে চাইছে কেন? বিয়ে-শাদিতে উভয়পক্ষ সমকক্ষ হলে বোঝাপড়া ভালো হয়,মা।
– দাদাও রাজী ছিল না। কিন্তু ইন্দিরার চাপে নাকি শেষে মত দিয়েছে। ওকে কোনোভাবেই নাকি বোঝানো যাচ্ছে না।
– বিয়ে কবে,মা?
– পরশু ,শুক্রবার।
– ছেলে কী করে?
– বড় লোকের ছেলে। কী আর করবে?
– বলছি, চাকরিবাকরি করে কিছু?
– না। তবে টাকাপয়সা আছে। এলাকায় নাকি খুব প্রভাব।
– কিছু করে না? কেবল বাবার টাকায় চলে? তাহলে বিয়েটা কি ভালো হবে,মা? আচ্ছা,ছেলে কী পাস?
– কী যেন বলছিল ওরা, বিএ পাসটাস হবে বোধ হয়।
– ভালো করে খোঁজ নেওয়া উচিত।
– খোঁজ নিয়ে কী হবে? মেয়ে তো কারো কথা শুনছে না। ঐ ছেলেকে ছাড়া সে বিয়েই করবে না।
– ছেলেটা বড়লোকের বখাটে ছেলে নয়তো?
– তা কী জানি!
– পেপারে কত খবর পড়ি। সারাদেশে কত কী যে ঘটছে। এত অসম সম্পর্ক সুখের হয় না,মা।
এর মধ্যে শ্রীশের খাওয়া দাওয়া শেষ হলো। গামছায় মুখ মুছতে মুছতে সে বললো-
– মা, সামনের সপ্তাহে আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল, তাই চলে এলাম। রবিবারই আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে।
– বিয়েতে যাবি,বাবা?
– আমার পড়ার খুব চাপ,মা।

বিকেলের পর থেকে হঠাৎ করে শ্রীশের শরীর খারাপ হতে লাগলো। রাতে ১০২ ডিগ্রী জ্বর উঠলো তার। তিনদিন টানা জ্বরে শয্যাশায়ী হলো। যৌবনও মাঝে মাঝে পরাজিত হয় জ্বরের হাতে। খবর এলো শুক্রবার যথানিয়মে ইন্দিরার বিবাহকার্য
সম্পন্ন হয়েছে। বর সদলবলে এসে ঢাকঢোল পিটিয়ে নাকি তাকে শ্বশুর বাড়ির দোতলায় নিয়ে গেছে। তবু শ্রীশের বুকে কেন যেন বেদনার বাদ্যই কেবল সশব্দে বাজতে লাগলো,অন্তরে আনন্দের সুর পেল না। সূর্যালোকেও মাটিতে বারবার একটি অপচ্ছায়ার উপস্থিতি যেন সে দেখতে পেলো।
জগৎ বড়ই বিচিত্র জায়গা। কত কী যে ঘটে এখানে।সকালে যাকে আলিঙ্গন করেছি,হয়তো সন্ধ্যায় সে শ্মশানে আমার চিতা সাজাবে। কিছু কিছু সত্য কেবল স্রষ্টারই বুঝি জানা থাকে। সে
রহস্য খোলার চাবি মানুষের হাতে থাকে না।
রবিবার বিকেলে মা’কে প্রণাম করে শ্রীশ ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হবে,এমন সময় খবর এলো,বৌ-ভাতের রাতেই ইন্দিরাকে শ্বশুর বাড়িতে ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। খবরটা শোনামাত্রই তার হাত থেকে ব্যাগটি পড়ে গেল। তার মনে হলো, হৃৎপিণ্ডে কেউ যেন বরফ ঠেসে ধরেছে। তবু এই প্রথমবার বাড়ির সবার চোখে জল দেখে অশ্রুস্নাত শ্রীশ বেরিয়ে পড়লো।
খুলনা থেকে ঢাকা- সারা পথ রাতভর জীবনের মানে খুঁজেছে সে, সমাজ-সংসার-ভালোবাসা- ত্যাগ-মৃত্যু-ইহকাল-পরকাল বোঝার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবকিছু অন্ধকার আর রহস্যের আবরণে আবৃত থেকে গেল। শুধু মনে হলো,রাতের ঈগলের মতো সবকিছু কেবলই ছুটে চলেছে সামনের পানে;ওদিকে ছায়ারা কেবল ফিরে যাচ্ছে পিছন থেকে পিছনে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধ আর বধির বিবেক। তবু সময় তার বাঁশরি বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে সমুখের জলসায়! রাতের দীর্ঘ বাসভ্রমণ শেষে বেদনার্ত বুকে ভোরবেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্টোবর স্মৃতিভবনের চারতলার নিজ রুমে পৌঁছালো শ্রীশ। মশারীর ভিতর থেকে আধোআধো ঘুমে তার রুমমেট তার হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে বললো,

– দুপুরে এসেছে। খামটা আনমনে ড্রয়ারে রেখে সে স্নানাদি সেরে নিল। দুশ্চিন্তা আর রাতজাগা ভ্রমন ক্লান্তিতে প্রচণ্ড মাথা ধরেছে তার। রুমমেট তপনের সঙ্গে তেমন কোনো কথা না বলে সে ঘুমিয়ে গেল।
ঘুম ভাঙ্গলে হঠাৎ তার চিঠিটার কথা মনে পড়লো। ড্রয়ার থেকে খামটা বের করে দেখলো ‘ছোটবুড়ি’ নামলেখা সেই মেয়েটির লেখা চিঠি। দ্রুত খামটা খুলে চিঠিটা বের করলো সে। নীচে নামটা দেখে মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল শ্রীশ।
কয়েকটি লাইনের চিঠিতে লেখা ছিল-
“দাদা,
আমার প্রণাম নিও। আমি তোমার মামাতো বোন।আমি খুলনা কলেজে(বয়রা) বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করছি। জানো দাদা, আমার ভাবতেও কষ্ট হয় তোমার মতো দাদা থাকা সত্ত্বেও সবার সামনে- বিশেষ করে বান্ধবীদের সামনে বলতে হয় -আমার
তেমন কেউ নেই। আমি ভাবতাম, মামার বাড়ির আবদার সবাই পেতে চায়। কিন্তু আমার ধারণা
ভুল। কারণ, মামারা যদি অর্থবান বা বড়লোক না হয়, তাহলে কেউ সে রকম মামার বাড়ি যাওয়া তো দূরে থাক, তাদের খোঁজখবরও রাখেনা। আমার চিঠি তুমি সময়মতো পাবে কিনা জানি না, যদি সত্যি পেয়ে থাকো,তবে শুক্রবার আমার বিয়েতে যেন তোমাকে আমাদের বাড়িতে পাই। আমার কেবলই কেন জানি মনে হয়, তোমার সাথে হয়তো আমার কখনো দেখা হবে না। বাবার কাছে,দাদাদের কাছে তোমার কত যে কথা শুনেছি! দাদা,তুমি কি দেখতে দেবতার মতো! যদি কখনো আমার কথা মনে পড়ে,আর তা যদি হয় আমার মৃত্যুর পর, তবে এই অবহেলিত বোনটির জন্যে একটি গান লিখো তুমি।
-ইতি তোমার না দেখা ইন্দিরা(ছোটবুড়ি)।

Share Button