জীবনের লক্ষ্য: শিশুমনে এর প্রতিক্রিয়া।।সুবাস রায়

রবিবার, মে ৬, ২০১৮ ৩:১৩ অপরাহ্ণ
Share Button

ই লেখাটি এমন একজন বরেণ্য ব্যক্তির কথা দিয়ে শুরু করতে চাই যিনি আমাদের জীবনের অনেক সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। বিশেষত আমাদের তরুণ সমাজকে হতাশার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অনেক সাহস দিয়েছেন। আমাদেরকে জীবনের জয়গান শিখিয়েছেন। আরও অনেক কিছু। বরেণ্য এ ব্যক্তিটি হচ্ছেন ভারতের একজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতিদের অন্যতম। তিনি তথাকথিত কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব নন। এখানে ‘জনপ্রিয়’ শব্দটি নিয়ে দুটি কথা বললে হয়তো ভালো হবে। জনপ্রিয় বলতে শুধু এমন কেউ নন যাকে সারা পৃথিবীর মানুষ চেনে। শুধু শুধু মানুষের কাছে পরিচিত হলেই জনপ্রিয় হওয়া যায় না। জনপ্রিয় বলতে আমরা ব্যক্তির পরিচিতির এমন একটি অবস্থাকে বুঝব যা একটা আদর্শকে তুলে ধরে। যাকে অনুসরণ করে জীবনে সঠিক পথে চলা যায়। সে নিরিখে, জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি তাঁরাই যাঁরা তাঁদের জীবনাদর্শ দিয়ে আমাদেরকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের কর্ম ও বাণী দিয়ে তাঁরা আমাদের জীবনচলার পথকে সুগম করে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। আমরা যখন যখন জীবনের কঠিন সংকটের সম্মুখিন হই, তখনই এইসব মহান ব্যক্তির দ্বারস্থ হই। বিপদ নামক তমসা থেকে মুক্তির আলোক দেখি। যিনি তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ জ্ঞানালোকে দিয়ে একটি তমসাচ্ছন্ন সমাজ কিংবা রাষ্ট্রকে কিংবা ক্ষুদ্র আকারে যদি বলি একজন মানুষকে আলোকিত করে চলেছেন। তিনি হচ্ছেন ড. এপিজে আবদুল কালাম। যিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী, লেখক, গবেষক; সর্বোপরি একজন আদর্শ মানুষ। যিনি আক্ষরিক অর্থে তাঁর জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু তিনি তাঁর সাধনা ও ঐকান্তিক পরিশ্রম দ্বারা যেখানে পৌঁছালেন সেখান থেকে আমরা পেলাম একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় ও তাঁর অবিশ্বাস্য সাফল্যগাথা। তাহলে প্রথম জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন এই আধলোকিত মানুষটি? তিনি হতে চেয়েছিলেন যুদ্ধবিমানের পাইলট। এখানে উল্লেখ্য, তাঁর বাবার উদার দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর মায়ের কোলমতা তাঁর পরবর্তী জীবনে অপরিমিত প্রভাব ফেলেছিল।
সাধারণত আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলের আগে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে বা চিকিৎসাবিদ্যায় বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তির আগের স্তরে ছাত্রদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়, সে কী হতে চায় বা তার জীবনের লক্ষ্য কী। এমনও দেখা যায় একজন শিশু স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই এরকম প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। এ প্রশ্নটি এমন একটা পর্যায় থেকে জিজ্ঞেস করা হয় যখন সে কেবল একজন শিশু। যার কোনো পেশা, জীবন বা জগৎ সম্মন্ধে ন্যূনতম ধারণা নেই। যে কারণে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই শিশুটি যে উত্তর দিচ্ছে তা তার বাবা-মা অথবা নিকটজনদের কাছে শেখা কোনো শব্দ বা শব্দগুচ্ছ যার সাথে শিশুটির থাকে না কোনো প্রকার পরিচয়। আর আমরা বেশির ভাগ মানুষ যে উত্তরগুলো শুনতে চাই তা হলো- সে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। যখন কোনো শিশু তার জীবনের লক্ষ্য কী এ প্রশ্নের জবাবে বলে যে, সে ডাক্তার হতে চায়। আমরা সবাই হাতে তালি দিই। বলি, ছেলেটা বা মেয়েটা হেভি কিউট! অথবা বলি, দেখতে হবে না, ছেলেটা কার বা মেয়েটা কার! ইত্যাদি। তবে একটা দুঃখজনক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটা হলো, আমরা জেনেশুনে কখনোই কোনো দরিদ্র পরিবারের সন্তানকে জিজ্ঞেস করি না তার জীবনের লক্ষ্য কী। তাহলে দরিদ্র শ্রেণির পরিবারের শিশুরা এ প্রশ্নটি শুনতে পায় না। পেয়ে থাকলেও সেটা হয়তো কোনো একটা স্তরে তার পরীক্ষার ফল খুব ভালো হলে বা অসাধারণ কোনো সাফল্যের পর। সেটাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশ্নটি অতটা আন্তরিক থাকে না। এরকমটা ঘটে বিশেষ করে যদি এ প্রশ্নটি শ্রেণিকক্ষের বাইরে হয়। অন্য অনেক বিপত্তির মধ্যে প্রধান হচ্ছে শিশুদের প্রতি এ ধরনের আচরণ শ্রেণিবৈষম্যকে ইঙ্গিত করে। বিশেষ একটা শ্রেণির প্রতি আনুকূল্য দেখানো। অন্য কথায় এটি শিশুদের প্রতি একটা চরম বৈষম্য প্রদর্শন। সকল শিশুর এই প্রশ্নটি শোনার ইচ্ছে আছে। কিন্তু পারিবারিক অর্থনীতি তাদের এ প্রশ্নটি শোনা থেকে বঞ্চিত করে। এইসব শিশু জীবনের বড় কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিতবোধ করে। অসহায়বোধ করে।
সবশিশুই শুনতে চায় এই প্রশ্নটি। আমরা সবশিশুর কাছ থেকে উত্তর শোনার আগ্রহ রাখি না। কী ভীষণ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে আমাদের শিশুরা! আমরা শুনতে চাই না কোনো উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশু বলুক, সে পানের দোকান দিতে চায়। অথবা সে বাদাম বিক্রেতা হতে চায়। সে শিক্ষক হতে চায়। আমরা চাই না, আমাদের শিশুরা কৃষক হওয়ার স্বপ্ন দেখুক। আমরাই নির্ধারণ করে দিচ্ছি সে কী বলবে। সে কী হবে। ফলে ওরা বড় হয়ে সব পেশার মানুষকে সম্মান করতে জানে না। আরও একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে। দরিদ্র পরিবারের কোনো শিশু যদি বলে, সে ডাক্তার হতে চায়। তবে চারিদিকে তাকে নিয়ে হাসির রোল ওঠে। কী অসহায়! কী নির্মম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ওই শিশুটিকে! কেননা, সবার ধারণা যে, একটা দরিদ্র শিশু কিছুদিন পরে স্কুল থেকে ঝরে যাবে। ক্ষেতে-খামারে কাজ করবে। সে একদিন অনিবার্যভাবে তার নির্মম ভাগ্যকে বরণ করে নেবে। কী অসহায় পরিস্থিতিতে একটি শিশুকে ফেলে দিতে পারি আমরা।
এপিজে আবদুল কালামের কথায়, ‘‘জীবন এবং সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। জীবন শেখায় সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করতে আর সময় শেখায় জীবনের মূল্য দিতে।’’ আমাদের চিন্তা এবং ধারণাগুলো আমরা কোমলমতি শিশুদের উপর চাপিয়ে দিই। একটা শিশু তার চারিপাশের পরিবেশ থেকে জ্ঞান লাভ করে সে তার ভালো লাগার বস্তুটি নির্ণয় করে। এটা কিন্তু চূড়ান্ত নয়। রবীন্দ্রনাথ শৈশবে ঘাটের মাঝি হতে চেয়েছিলেন। তাঁর বাবা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেননি, তুমি কেন ঘাটের মাঝি হতে যাবে? জমিদারের ছেলে ঘাটের মাঝি হতে চায়। জমিদারের জাত থাকে? প্রকৃত সচেতন বাবা সন্তানদের আবেগ-অনুভূতির কোমল জায়গাগুলোতে ছুরিকাঁচি চালান না। চালালে শিশুটির কোমল অনুভূতির জায়গাটিতে নিজের অধিকার হারিয়ে ফেলে। তার নিজস্ব বলে কিছু থাকে না। এ সন্তানটি আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না। ফলে আত্মনির্ভরশীল হওয়াও তারপক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দারিদ্র্য যদি অলঙ্ঘ্য বাঁধা হতো তবে কাজী নজরুল ইসলাম রুটির দোকানেই কাজ করতেন, এত বড় কবি হতে পারতেন না। দরিদ্র নজরুল ইসলাম আমাদের গৌরব। তাঁকে আমরা জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছি। এপিজে আবদুল কালাম খবরের কাগজ বিক্রেতা ছাড়া আর কিছু হতে পারতেন না। ড. আতিউর রহমান অর্থনীতিবিদ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারতেন না। ড. মোজাম্মেল হক বড় অর্থনীতিবিদ হতে পারতেন না। আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তির কাছে কোনো কিছুই বাঁধা হয়ে থাকতে পারে না। সেজন্য আমাদের কাছে থেকে তাদের উদ্দীপনা প্রাপ্য। তাদেরকে উদ্দীপ্ত করতে হবে। সব ধরনের শিশুর মধ্যে সাহস যোগাতে হবে। গোল্ডেন এ প্লাস, এ প্লাস বা অন্য প্রকার ফলের উপর অকারণ গুরুত্ব না দিয়ে যে কোনো ফলাফলে তাদের আত্মবিশ্বাসকে অটুট রাখতে সাহায্য করার জন্য তাদের পাশে থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে টমাস আলভা এডিসনের স্কুলজীবনের গল্পটি বলা যায়। তিনি তিন মাসের বেশি স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। তাঁর মা ছিলেন সুশিক্ষিত। একটি স্কুলে পড়াতেন। তিনি এক পর্যায়ে তাঁর সন্তানকে নিজ বাড়িতে পড়াতে শুরু করলেন। কেন? একদিনের স্কুলের ঘটনা এরকম। এডিসন খানিকটা দূর থেকে স্কুল-পরিদর্শকের কাছে একজন শিক্ষককে বলতে শুনলেন, এডিসন ছেলেটি আধপাগলা গোছের। মানে হাবাগোবা আরকি! বাড়ি ফিরে মাকে এ কথা জানালেন। তাঁর মা স্কুলে গিয়ে ওই শিক্ষককে বলে আসলেন, এডিসন সেই শিক্ষকের চেয়েও মেধাবী। মায়ের কথা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে- এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের সবকিছুর মাঝেই অমিত সম্ভাবনা দেখার দৃষ্টি তৈরি করতে হবে। একটু দৃষ্টি ফেরালেই আমরা আমাদের চারিদিকে সকল ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিত্ব দেখতে পাব। একটি সুন্দর বা আদর্শ সমাজ, রাষ্ট্র বা পৃথিবীর কথা ভাবলে আমাদের সবক্ষেত্রে যোগ্য, দক্ষ, সৎ, নিষ্ঠাবান মানুষ প্রয়োজন। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি আমরা মানুষ হিসেবে কতটা সফল হতে পেরেছি তার মূল্যায়নও করতে হবে। নীতি, আদর্শ ও মানবীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে আমাদের জীবনাদর্শকে নির্মাণ করতে হবে। যেখানে একমাত্র লক্ষ্য থাকবে জগতের কল্যাণ। যখন সবার মর্মবাণী হবে, স্রষ্টাকে ভালোবাসতে চাইলে আগে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। অথবা হৃদয় সমৃদ্ধ থাকবে এই সত্যে, সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

লেখক- সুবাস রায়;প্রভাষক,উত্তরবাংলা কলেজ,কাকিনা ও পিএইচডি গবেষক রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়।

Share Button