ডাকিনী নদী

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৫, ২০১৭ ১২:২৮ অপরাহ্ণ
Share Button

পিয়ালী জানা

নদী বরাবরই টানে আমাকে। এক অদ্ভুত কারণেই ডাকে। ডাকে কারণ সে কখনো মরে না। গরমে বুড়িয়ে যায়, বর্ষায় আবার যুবতীর ভরাট উচ্ছলতা ধারণ করে। অনেক নদীকেই মন ঝুলিতে ভরেছি । আবারো বেরোলাম নদী শিকারে। তবে এবারের নদী যে আমাকেই শিকার করবে ঘুণাক্ষরেও টের পাই নি।
কোচবিহারের পথ টানল এবার। শীতের পরিযায়ীর পালক সবসময়ই আমার মনে গাঁথা থাকে। পায়ের তলা মাটি ছাড়তে চায় খালি খালি। সন্ধানে এলো বামুনঘাটা নাম এক গ্রামের ঠিকানা। এরই বুক চিরে সোনালী ধাঁধা বা সোনালী প্রেম জাগানো চঞ্চলা নদী রূপমতী । গাঁয়ে ঢুকতে ঢুকতেই পায়ে পায়ে চোখে চোখে রাখলাম সুন্দরীর দিকে। নাকি ও আমাকে নজরে রাখছিল তাই বুঝতে পারলাম না। শুধু মোহিত হলাম তার ছলাৎ ছলাৎ গা দোলানোর ভঙ্গিতে ;বড্ড রূপ আহা। শেষে পা ঠেকলো এক চায়ের দোকানে। নদীর অমোঘ টান আমার মনকে পৃথিবীর শেষ বিন্দুতেও নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে পারে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু শরীর তো হাত তুলে নেয়। শেষে চা চা করে ওঠে মনটা। গাঁয়ের দোকানের চা তার সংগতে উডুক্কু গল্পের মুচমুচে দিশি ধাঁচের বিস্কুট। আহা সত্যিই ক্লান্তি কর্পূর হল।
যা যা শুনতে পেলাম তাতে নদীর কথা কিন্তু পাওনা হল ভালোই । ও নদী সেয়ানা, ও টানতে জানে, বাঁধতে জানে পাগল করতে জানে। ওর পাড়ের মানুষজনই ঘৃণাভরে ওকে ডাকিনী মানে ডাইনি বলে গাল দেয়। তবে জোর গলায় নয় ফিসফিসিয়ে, চুপিসারে, চোরের মতন। ওরা বলে ও নদী নাকি সব শোনে শুয়ে শুয়ে। না এ কোন লোক কথা নয়।
রাত বাড়লে সে নাকি উলঙ্গিনী নৃত্যে মাতে, উল্লাস গান গায়। তার শিকার হয়েছে বহুজন।তার রূপ মোহ চপলতা এ সবই তার রূপমতী নামের কারণ কিন্তু হলে কি হবে সে রূপ যে ভয়ংকর নিশি পাওয়া।
লোকে নাকি তার রূপমতী নাম ভুলতে বসেছে। এই ত নাকি দুবছর আগের কথা সুদূর ইউরোপ থেকে ফুর্তি করতে আসা এক গোরা সাহেব এই ডাকিনীর বুকে আলোর সে কি রোশনাই দেখেছিল কে জানে তাকে ওর চর থেকে ফিরতে দেখে নি কেউ। ওর সাথীরা বহু খোঁজাখুঁজি করেও ওকে খুঁজে পায় নি । লোকেদের এও বলতে শুনলাম সাহেব নাকি নেশাচ্ছন্নতায় নদীকে প্রেয়সী ভেবে ওর শরীরেই আশ্রয় নিয়েছে ;তার প্রাণ জুড়িয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। এ ঘটনার বেশ কয়েকদিন পরই গাঁয়ের ছেলে বিজন নদী পাগল হল। বলে নদী নাকি যুবতী ডাগর মানবীর হাতছানিতে ডাকে। তাকে নিশি কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে নদী, তার যৌবনপ্রাপ্তির অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছিল। বিজনের চোখে মুখে শুধুই রূপমতীর মোহান্ধ প্রেমিক উঁকি দেয় ছটফটিয়ে মরে। বিজন নদী পাগল হল।
নিশি কালো চুল জোছনা জরির পাকে চিকচিক রেশমী শাড়িতে সর্পিল কায়দায় হেঁটে আসে রূপমতী মানবী শরীর ধরে আর বিজন মিলে যেতে চায় বুকে ধরে ডাকিনী সে শরীর। তারপর থেকে বিজন ফেরে নি। গাঁয়ের লোক ঘেন্না করে আত্মা শরীরের রূপমতীকে। অভিশাপ ছুঁড়ে দিয়ে জ্বালা জুড়োয়। কিন্তু তাতে ডাকিনী শুকায় কই। বরং আরো ফুলে ফেঁপে ওঠে তার নাগিনী গতর, তার মন ভুলানো রূপ, তার বাঁকা নেশা ধরানো চলন। লোকে যত রাগ করে ও যেন শয়তানি হাসি হাসে আরো। নেহাত নদী তা না হলে মানবী হলে কবেই ওকে শেষ করে শান্তি পেত গাঁ সুদ্ধ লোক।রূপমতী তবু কাউকে পরোয়া করে না।
আমার মনে কেমন যেন একটা আশঙ্কা মেশানো আকর্ষণ জাগতে লাগল। যাক গে নদী পাগলামিকে একটুখানি মনের বসারঘরে বসতে দিয়ে কোথাও একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজ করতে গেলাম পেয়ে ও গেলাম অনায়াসেই। তবে ঘর বাছাই করলাম নদী র কাছাকাছি জায়গায় যেখান থেকে শিকার শিকারী সম্বন্ধটা বেশ তারিয়ে উপভোগ করা যাবে। সারাদিন ধরে লক্ষ্য করলাম সূর্যের সাথে রূপমতীর অনির্বচনীয় খেলা, প্রেম প্রেম খেলা, আবেগ অনুভূতির খেলা। সূর্য ক্যানভাস খুঁজে পেয়েছে তার বুক জুড়ে। নিত্য নতুন মুহূর্তে নতুন নতুন রূপে সাজায় তাকে। আলোর বদলের সাথে সাথে রূপমতীর বয়স বাড়ে কমে, কিন্তু চাঞ্চল্য, আকর্ষণ কমে না। সূর্য ওর প্রেমিকার বুকের গোপন রহস্য জানতে চায় কিন্তু রূপমতী বারবার প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দেয়। আর এই মান অভিমানের মাঝে সন্ধ্যা নামে সূর্য ফিরতে বাধ্য হয়।
তারপর সখী হয়ে চাঁদ আসে তার মনোহারী পসরা সাজিয়ে তারার খোঁপা সাজ নিয়ে। রূপমতীকে আলতা পরায় ঠোঁটে গালে রং লাগায় জরিদার শাড়ি পরায় নূপুরের রিনিঝিনি বাজে। ওকে প্রেমিক ভোলানোর মন্ত্র শেখায়। মোহময়ী হবার আদব রপ্ত করায়। কত খুনসুটি সখী গল্পে মাতে মেয়েলি গল্প প্রেমিক ধরার প্রেমিক ছাড়ার গল্পে, প্রত্যাখ্যানের আবেদনের গ্রহণের গল্পে। নদী এই মুচকি হাসে আবার প্রতিবাদ ঢেউ তুলে দেয় চাঁদের দিকে। কলঙ্কিনীরা এভাবেই গল্প করে।
কলঙ্ক কলঙ্ক বড় ডাকে আমাকে ডাকলোও আমাকে। এক দুটো অদৃশ্য হাত যেন টানলো আমাকে অতিমানবীর বুকে। আমার কাছেও রূপমতী কখন যেন মানবী হয়ে গেল বুঝতে ও পারি নি। আমিও হয়তো প্রেমে পড়ে গেছিলাম। খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হল শিকারী নিজেই শিকার হয়েছে। ইচ্ছে করল রূপমতীর বুকে শুয়ে ওর হৃৎস্পন্দন শুনি। ওর সব আপন কথা বুক চিরে ছিঁড়ে বার করে নি। একটুও ভয় করছিল না আমার। ওর উষ্ণ শীতল জরায়ুতে ডুবে যেতে চাইলাম। হঠাৎ কে যেন কান ঘেঁষে নরম লতিতে চুমুর আদর দিয়ে বললো, ”তুমি ভালো মানুষ। ফিরে যাও। আমাকে শিকার করতে পারবে না তুমি। আমি বন্দি হই না। দাসত্ব করি না কারো। যে আমাকে বাঁধতে আসে আমি তাকে ই আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বাঁধি যে সে বাঁচে না গো। তুমি ভালো মানুষ সংসারী আমি তোমার সংসার ভাসাতে পারি না। আমি রোজ রোজ কত মেয়ের সংসার তছনছ হতে দেখি। ঘেন্না হয় ঘেন্না। মেয়ে গুলো আমার বুকে দাঁড়িয়ে শেষবারের মত বলে ওঠে তাদের নদী হবার ইচ্ছা মুক্ত ধারায় চঞ্চল জীবন স্বাধীন আনন্দে। তারপর তারা সত্যিকারের স্বাধীন হয়ে যায়। তুমি জোছনা নদীকে ভুলে যাও তুমি পাগল হোয়ো না। ফেরো ফেরো। আরো আরো নদীর খোঁজে যাও। নতুনের খোঁজে যাও। আমি যে কলঙ্কিনী কুহকিনী তোমার এখানে কাজ নেই। দরদী মরমিয়া মনকে গিলে আমার বুকে কান্নার বান ডাকাতে চাই না। তুমি আর কাঁদিও না আমায়। আর না ফিরে যাও আমি ক্লান্ত তোমার খিদমত করতে পারব না পারব না।
ওভাবে কতক্ষণ রূপমতী র বুকে পড়েছিলাম জানি না জেগে উঠে বসতেই চোখে অজানা কারণেই হাত গেল অনুভব করলাম আমার চোখের কোণ ভিজে। কিছুই বুঝতে পারলাম না। তারপর মনে পড়লো নদী আমাকে ওর ব্যথার কাহিনী বলেছে। নদীও কষ্ট পায় ডোবাতে, ঘর ভাঙতে, যেখানে মন থাকা সত্ত্বেও মানুষ কষ্ট পায় না। আমার মনে পড়ে যায় কিভাবে সভ্যতা নদীকেও ধর্ষণ করে বাঁধ বাঁধে ভাগাভাগি করে। সবটাই নিজেদের প্রয়োজনে। সেও যে এক নারীসত্ত্বা, তাই হয়তো আরো বেশি করে ভুলে যাই তাকে সম্মান করতে। তাকে ব্যবহার করি বারবার সবটাই দরকার। আর সে যখন সহ্য করতে চায় না শৃঙ্খল ভাঙতে চায় সভ্যতা হায় হায় করে ওঠে। ছিঃ ছিঃ ধিক এ কৃত্রিমতা কে সব গজিয়ে ওঠা ছত্রাকের বিনাশ হোক। এই নিয়েই বিভোর হয়েছিলাম বেশ একটা লম্বা সময় স্বপ্নাহতের মতো। হঠাৎই রীতিমতো ভয় পাইয়ে গগনবিদারী এক চিৎকার সম্বিত ফিরলো আমার। মনে হল পাগল হবে আমাকে আটক করে আকাশ বাতাস আবার করুণ আর্তনাদ ভরে কেঁদে উঠল, ‘আমার আমার মেয়ে টা ওর বুকেই ঘুমোচ্ছে জান। আরো কতশত গাঁয়ের নির্যাতন সওয়া মেয়ে মানুষগুলো শরীর জুড়িয়েছে রূপমার জলে। ও যা করে বেশ করে। আমার মেয়েটা গ্রামের এক ছোঁড়ার মিথ্যে মন ভুলানো ফাঁদে পড়লো। শয়তানটা ওর সর্বনাশ করতে পিছপা হল না। ওর উঁচু পেট দেখে গাঁয়ের মানুষগুলো র সেকি নোংরা কথা। আমি সইতে পারলুম না। মেয়ে টাও পারল না। হাত পেতে ভিক্ষে চাইলাম শয়তান টার বাড়ি র লোকের কাছে আমার কালো সোনা কে ওদের বৌমা করে নিতে হাতে পায়ে পড়লুম। হাঁড়ি দড়া ধরিয়ে ওরা বলল যা পোড়ামুখি ডুবে মর্গে বেহায়া নির্লজ্জ মেয়ে। সে কথা আমার মেয়ে টার মনে এমনভাবে বিঁধবে কি করে জানব বাবু।হাঃ ঈশ্বর। এ পাপ কি সইবে। বলো তুমি ই বলো। ও নদী যদি ডাকিনী হয় তবে এ পিশাচের গাঁ পিশাচের সমাজ। এ ভেঙে দে রূপমা ভেঙে দে মারে তুই ভেঙে দে। রূপ মা আমার তুই ডাকিনী নস আমার মেয়ে, মা’রে!’।

Share Button