নাইন্টিন ফাইভ টু ওয়ান ইলেভেন 

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৭ ২:১৫ অপরাহ্ণ
Share Button
সেবক বিশ্বাস
অকস্মাৎ দরজা খোলার ক্যাচক্যাচ আওয়াজে নাসিকাগর্জিত ঘুমটা ভেঙ্গে যায় গয়েশ ঘটকের। বদ্ধ দরজা কিভাবে খুলে গেল ভাবতেই তার মনে হলো,কে যেন তাকে টানছে কোমরে দড়ি বেঁধে। মাঝপথে সুখস্বপ্নের শিরদাঁড়াটা মটমট করায় শিরঃপীড়ার প্রচণ্ডতায় তিনি ক্রোধে চিৎকার করে উঠলেন,
– কোন শালারে?
কোনো উত্তর নেই। শুধু শব্দ দুটো দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।
অথচ তাকে অনিচ্ছায় সামনে হাঁটতে হচ্ছে। মানুষের জীবনে এমন অদ্ভুত ঘটনা কিভাবে ঘটতে পারে,সেটা তার মাথাতেই আসছে না।
ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুদূর আসতেই তিনি দেখেন, একটি আজব যানের পাশে কালো কাপড়ে ঢাকা দুটো আজব মূর্তি। শুধু লেজার রশ্মির ন্যায় তাদের চোখগুলো দেখা যাচ্ছে কাঁচ-চশমার ভিতর দিয়ে।
– এই,কে তোমরা? আমাকে এখানে বেঁধে আনলে কেন? ছাড়ো আমাকে।
জোড়াস্বরে যান্ত্রিক উচ্চারণ শোনা গেলো
-আমরা আপনাকে বেঁধে আনিনি। রিমোট কনট্রোল ব্যবহার করেছি। মানুষের গায়ে আমরা সচরাচর হাত দিই না। আমরা গ্রহপতির অধিবাসী।
– তা এখানে কোন নবাবগিরি মারতে এসেছ?
– আপনি নাকি নিজেকে বিশ্বসেরা বোদ্ধা মনে করেন! বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আপনি নাকি কটাক্ষ করতেও ছাড়েন না? তাঁরাই নির্বোধ আর আপনিই নাকি আসল বোদ্ধা! তাই মুক্তিযুদ্ধে নাকি আপনাকে শহীদ হতে হয়নি;বুদ্ধির জোরেই নাকি আজও আপনি বেঁচে আছেন?
মহামান্য নাইন্টিন ফাইভ টু ওয়ান ইলেভেন আমাদের আদেশ করেছেন,আপনাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে।
– এই বিচ্ছুর বিষ্ঠা,ফাজলামোর আর জায়গা পেলি না। বেজন্মা কোথাকার। দুটোকে গলা ধরে আছড়ে ঘিলু বের করে দেব।
– পারবেন না। আমাদের স্পর্শ করলে আপনি ভস্ম হয়ে যাবেন;আপনার ছাইও পাওয়া যাবে না,ভোল্টেজ এমন বাড়াবো।
মূর্তি জোড়া একই কথা একই সঙ্গে বলছিল। ঘটকের বোধশক্তি ভয়ে তখন ভেজা ঘাসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হঠাৎ স্পেসযানের দরজা খুলে যায় অদ্ভুত এক ওয়েলকাম টিউনে। প্রথমে মূর্তিদুটো শব্দহীন এবং পরে ঘটক বাহাদুর পুতুল নাচের পুতুলের মতো আকাশযানে উঠে পড়লেন। একটু ঝাঁকুনি লাগতেই মূর্তি দুটোর পিছনের সীটে তিনি গভীর ঘুমে ঢলে পড়লেন।
হঠাৎ কাদের অদ্ভুত কথাবার্তা কানে আসতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় তার। চোখ মেলতেই দেখেন পূর্বের ছায়ামূর্তিদ্বয়ের মাঝে এক বিরাট ছায়ামূর্তি। তার নজরে আসে কাগজের মত সাদা পর্দায় ঘেরা একটি নাতিশীতোষ্ণ ঘরে সাদা বিছানায় খালি গায়ে তিনি চিৎ হয়ে পড়ে আছেন। হাত দিয়ে লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করলেন।
– এই শয়তানের বাচ্চারা,আমার পোশাক কই?
– ওর ভয়েস পার্টস অফ করো।
ভারী গলায় সেই দীর্ঘমূর্তি অর্ডার দিতেই জোড়ামূর্তি কয়েকটা বোতাম চাপাচাপি করলো।
– এই,এই কী করছো? আমাকে চেনো?আমার ক্ষমতা জানো?
কিন্তু মনে হলো তার গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছে না। নিজের কথা তিনি নিজেও শুনতে পাচ্ছেন না।
– পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে মাননীয় নাইন্টিন ফাইভ টু ওয়ান ইলেভেন?
জোড়ামূর্তি একত্রে জানতে চাইলো দীর্ঘ মূর্তির কাছে।
-ওকে খুলে ফেলো।
– ওকে,মহামান্য।
দীর্ঘ মূর্তি অদৃশ্য হলেন।
ভয়ে কাঁপতে লাগলেন ঘটক সাহেব।
– এই,এই ছেলেরা কী খুলে ফেলবে তোমরা?
এবারও আগের মতই গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। প্রশ্নটি শব্দহীন শরের মত কেবল তারই বুকে বিঁধতে লাগলো। ছায়ামূর্তিদ্বয়ের একজন
হাতের একটি যন্ত্রের তিনটি বোতাম চাপতেই ঘটকের সমস্ত শরীরে একটা স্রোত বয়ে গেল। তিনি চেষ্টা করে এক ইঞ্চিও হাত-পা নাড়াতে পারলেন না। কী হতে যাচ্ছে ভাবতে না ভাবতেই মূর্তির একটির ইঙ্গিতে অন্যটি তার অসাড় নগ্ন দেহে কী এক তরল স্প্রে করে দিল।
– ওর হাত-পা খুলে ফেলো।
হঠাৎ দীর্ঘ মূর্তির উপস্থিতি ও আদেশ।
– আচ্ছা,মহামান্য।
প্লাস্টিকের পুতুলের ন্যায় এক এক টানে তার হাত-পা খুলে ফেললো মূর্তিদ্বয়। কোনো রক্তপাত হলো না,যন্ত্রনা হলো না। গয়েশ ঘটক নির্বোধের ন্যায় তার খুলে ফেলা হাত-পা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখতে লাগলেন।
– লোকটার পাঁজর খোলো।
আদেশ পালিত হলো।
– মাথা খুলে ফেলো।
কাজ যথাযথ এগিয়ে চললো।
মাথা খোলার পর ঘটকের আর কিছু জানা হলো না।
কিছুক্ষণ পরীক্ষানিরীক্ষার পর মূর্তিদ্বয় গ্রহপতিরাজকে জানালো,
– পায়ের হাড় বাঁকা,তাই লোকটি বাঁকা পথে চলে; পাঁজরের মাঝে কোনো ফাঁক নেই,তাই হার্টে কোমল কিছু পৌছায় না। আর মগজে অর্ধেক মল।
সব জেনে নাইন্টিন ফাইভ টু ওয়ান ইলেভেন জানালেন
– পায়ের হাড় সোজা করে দাও,যাতে লোকটা সোজা পথে চলতে পারে। পাঁজরের হাড়ে কিছুটা ফাঁক রাখো,যাতে সত্য ও সুন্দর মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। আর কেবল ভয়েস পার্টস নয়,মগজের মধ্য থেকে মল,জঞ্জাল,কুচক্র কার্ড- এসব সরিয়ে ফেলো।
দ্রুতই সব কাজ শেষ হলো।
সুস্থ শরীরে আবার চোখ মেললেন গয়েশ। হাত-পা নাড়িয়ে দেখলেন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।
শরীর-মন-মগজ-মাথা তার হালকা আর প্রফুল্ল মনে হলো। আনন্দে একবার চারিদিকে তাকিয়ে নিলেন তিনি।
দীর্ঘমূর্তি আবার তার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
গয়েশ ঘটক দেখলেন,ধীরে ধীরে মূর্তির মাঝ থেকে ছায়া সরে যাচ্ছে আর তাঁর সৌম্যকান্তির জ্যোতির্ময় আলোকিত অবয়ব থেকে একে একে বিষণ্ণ বদনে বের হয়ে আসছেন বাংলাদেশের সূর্যসন্তানেরা!ভাবলেন,এতদিন কত কটাক্ষই না করেছেন তিনি তাঁদের নিয়ে।
এইতো সুযোগ- ভেবেই তিনি ছুটে গিয়ে একের পর এক জড়িয়ে ধরলেন প্রত্যেকের পা।
স্পেসযানের দরজা খুলে গেল আবার। ঘটক পিছনের সীটে সীটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় মৃদু ঝাঁকুনিতে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন গভীর ঘুমে। যখন ঘুম ভাঙ্গলো,তিনি নিজেকে তখন দেখতে পেলেন তার কোমল শয্যায়। জানালা দিয়ে তখন ভোরের নতুন আলো এসে ঠিকরে পড়ছে বিছানায়। তিনি চিৎকার করে বলতে চাইলেন-
– তোমরা সকলে শোনো,
আমার ভুল ভেঙ্গে গেছে। ওঁরাই দেশের সূর্যসন্তান।
আমাকে ক্ষমা করো,আমাকে ক্ষমা করো।
কিন্তু তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো স্বরই বের হলো না।
একটি দোয়েল জানালার পাশে বেড়ে ওঠা আমগাছের ডালে বসে লেজ নেড়ে নেড়ে অবিরাম কেবল শিস্ দিতে লাগলো।
Share Button