পাঁচ কবিতার শিল্পস্বর।। সেবক বিশ্বাস।। ঈদ সংখ্যা ২০১৮

রবিবার, জুন ১৭, ২০১৮ ১২:০৩ অপরাহ্ণ
Share Button

 নির্লক্ষ্য মুক্তি

কী এক ব্যর্থ স্বাক্ষর শেষে খুলে যায় প্রথাগত জানালা! ঝুলে থাকা করুণ চুলে নৈঃশব্দ্যের প্রতিরূপে আঁকা ক্লান্ত অধ্যাস ঢলে পড়ে তীব্র উদাসিতায়। তবু গলিত চোখ প্রহেলিকার বাইরে খোঁজে সত্যের অভিজ্ঞান। নিচে অনাবৃত রাস্তায়
খসে পড়া আঙুলের ছায়ায় কেমন নিশ্চুপ নড়াচড়া!
ভেতরে অস্ফুট বাষ্প বিশ্বাসী বাতাসের সাথে মিশে যায়
প্রার্থনার মতো!
আলোহীন আকাশের উপচারে উৎসর্গিত জীবনপ্রবাহ
ছিঁড়ে ফেলে ফেনায়িত পাপ। কেবল
নির্লক্ষ্য মুক্তি ডানা মেলে অচেনা শূন্যতায়!



উপচ্ছায়ার মিছিল

দেখো,
শব্দের শহরে কেমন ঢুকে গেছে একলা পাথর!
শুকনো সন্ধ্যায় হেঁটে আসে যে ছায়া, তার শিরস্ত্রাণ জুড়ে কেবলই পলাশীর রঙ!
সুকুমার মুখ ভেজা পথের মরা কঙ্কাল! ক্রমশঃ রাত্রি নামে উড়ন্ত ডানায়- উপচ্ছায়ার মিছিল,
আস্তাবলে ঘোড়ার গুলবদন মুহূর্তে অস্তিত্বহীন-
সনির্বন্ধ সেতারে কেবলই শোকার্ত সময়ের গান!
আসলে
আঙুরের রক্তে কোনো পৃষ্ঠা নেই। মৃত্যু ঝিঁঝিঁ পাখির হঠাৎ নৈঃশব্দ্য!



ছায়া

প্রায়ই তিনটে ছায়া আমার সাথে ঘোরে
ঝুলানঘড়ির জিপসি কাঁটার মতো! অনেকবার ভাঙতে চেয়েছি ওদের। তাড়িয়েছি-
মেরেছি-
কখনো বা ভয় দেখিয়েছি উলঙ্গ মুখে! বরাবর ব্যর্থ আমি লুকিয়ে গেছি গাছেদের আড়ালে।
সময় শেষে
নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টারের মতো
ছায়ারা হেসেছে ব্রুটাসের ছুরি হাতে!
আমার ছায়ারা মুখ খোলে না। কেবল চুপচাপ কপাট বন্ধ করতেই ওরা লাফিয়ে ওঠে ঘাসফড়িঙের মতো! মধ্যদুপুরে ওরা সতর্ক বেড়াল, কখনো বা ঝুঁটিওয়ালা কালো কবুতর টহলদার রোদে!
তবু গোধূলি এলেই আমার ছায়ারা গোপন গন্ধরাজ-
রাত্রি এলে আমি নিজেই ছায়া হই ছায়াদের কাছে!




যথারীতি

অজস্র আলাপ চারপাশে,
চোখের সামনে দৌড়ে ফেরে অসংখ্য অজ্ঞাত গাছ-
মরা কাঠের মত কালো কুকুর, সবুজ ঘাসের গ্রীবা,
মৌলিক চিৎকার,
কাঁটার মতো সঙ্গতা,
প্রেমের প্যাঁচানো শেকড়, সতর্ক চোখ,
মানিব্যাগে বেঁচে থাকা ভালোবাসার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত!
অদূরে তফাৎ জলে ছায়ার অরক্ষিত ঘুম,
উড়োচুলে স্তব্ধ যাত্রীর চেয়ে থাকা, শয্যার গানে থেমে যাওয়া আঁচলের সুর! উড়ছে-
উড়ছে-
কেবলই উড়ছে দিগ্বিদিক মদের মায়ায়। পরিচিত দ্রাবিড় পথে অতৃপ্ত ডানার মিছিল!
রোদ ওঠে নতুন সময়ের-
তবু কিছু অন্ধকার ছুটে যায় যথারীতি আলোর পাশাপাশি।




মৃত্যু

মৃত্যুরে ডেকেছি কাছে গোধূলির বলয়িত উৎসবে!
দিনান্তের প্রিয়তম ছায়ায় সব খেলা শেষে নক্ষত্রের বুকে- অনন্তের অগাধ শূন্যতায়-
তার অস্ত মুখের মতো মলিন পথে হেঁটে যাবো দীর্ঘ প্রণাম শেষে পৃথিবীর পায়ে!
সংসারের সত্যে ফেলে যাওয়া প্রেম,
গান,
গোপন মূল্যে কেনা মরণের ঘুম-
দীর্ঘতম সুন্দর ক্রোড়েরত বিমূঢ় উঠোনখানি;
মৃত স্বপ্নের ভীড়ে জেগে থাকা করুণ হাসির পল্লবিত ঠোঁট!
কোনো এক বেহালার রাতে সপ্তসুরের আশ্চর্য অনুভবে নিঃসংকোচ আলোর সন্ধান-
গুঞ্জরিত বিন্দু বাতাসে আত্মার উপচার!
রক্তসিন্ধু থেকে চাঁদের নাভিমূল-
নড়ে ওঠা সত্যের শঠতা
নিষ্ফল সমূদ্রের বাতাস ভেঙে আগুনের পথে;
লুপ্ত জলের তৃষ্ণা রাতের বাহু থেকে ক্রমে ক্রমে খয়েরি চেতনায়!
ইতিহাস মরে কি লোকোত্তর কালকূটে!
চিরস্থায়ী প্রশ্নের মতো একান্ত বিশ্বাসে প্রহেলিকার পৃথিবী থেকে সান্ত্বনার আকাশকুসুম-
ছিঁড়ে যাওয়া সময়ের গিঁটে জন্ম নেয় নতুন উত্তরণ!
প্রাচীন পাণ্ডুলিপির অন্তরালে যে নিঃসঙ্গতা একাকী হিজলের মতো-
তার মূঢ় পাতায় তিমিরের ছায়াপথ।
আত্মপ্রসাদ- খুলে যাওয়া নিষ্ফল পালকের মতো উন্মুক্ত বস্তুপুঞ্জ,
নগরের সেলসিয়াস ক্রন্দসী মাটির কঙ্কালে;
তবু মানুষ এক গ্রাম!
কংক্রিটে ঘাসের মতো শুয়ে থাকে কত পাখি,
অন্তহীন সময়ের সুরে গান ধরে পৃথিবীর প্রথম নদী!
পশ্চিম থেকে পূর্বে অতৃপ্ত যুবকের মতো
কালের দূরবীন নিঃশব্দে চেয়ে দেখে
প্রান্তরে প্রান্তরে কেবল মুছে যাওয়া হরিণের হাড়,
বিক্ষত বুকের রিক্ততা,নিঃশ্বাস-
মুক্তোদানার মতো দুঃখ,
অচল ঘড়ির জীবনপ্রবাহ;
কালে-কালান্তরে পথহাঁটা নবীন উল্লাসে
অনুরাগ,পরিহাসের পুরোনো আখ্যান-
শোকের শ্লোকে
উজ্জ্বল অন্ধকারে গাঁথা মৃত্যুর শঙ্খমালা!

Share Button

আপনার মতামত দিন