প্রকৃতির বৈচিত্রময় বান্দরবান।। ইমরান এমি

বুধবার, নভেম্বর ২২, ২০১৭ ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
Share Button

        দৈনন্দিন জীবনের গতানুগতিকতার মাঝে এমন কোন কোন বিষয় থাকে যার রসায়নে মানুষ হয়ে উঠে উজ্জীবিত। কর্মদ্দীপনায় উদ্ভাসিত এবং জীবনের প্রাত্যহিক শ্রম এবং একঘেয়ে চলার পথকে করে ক্লান্তিহীন, চির সবুজ। এমনি এক আনন্দময় বিষয় হচ্ছে ভ্রমন। আর তা যদি হয় নিজ দেশেই তাহলে তো কোন কথাই নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন,
“ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর থেকে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু”
কিছুদিন আগে আমাদের এমনই এক অসাধারণ ভ্রমনের সুযোগ হয়েছে বান্দরবানে। বান্দরবান স্রষ্টার অসাধারণ এক অপরুপ সৃষ্টি। পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকে তাঁকে আলাদাভাবে যত্ন করে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছেন নিজ হাতে। নির্দিষ্ট দিন বৃহস্পতিবার ভোরে ঘুম ভাঙ্গল সহকর্মী সুমন শাহ’র ফোনে। ঘুম থেকে উঠেই আনোয়ারা অনলাইন প্রেসক্লাবের সদস্যদের সাথে মিলিত হলাম চাতরী চৌমহনীতে। এক এক করে সকলে এসে গেল। সকাল দশটায় রওনা হলাম রুপকন্যা বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি সাতকানিয়া কেরানীহাট। অপেক্ষা করছেন অনেক্ষণ ধরে সাতকানিয়ার স্থানীয় দুইজন সংবাদকর্মী। নাস্তা আর আলাপ সেরে লোকাল বাস ইউনিক করে রওনা হলাম আবারো। দুই ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে বান্দরবান পৌঁছাতেই স্থানীয় সংবাদকর্মী আলাউদ্দীন শাহরিয়ার ফোনে আবাস হলো বান্দরবান পুলিশ সুপারের বাসভবনের সম্মুখে উচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পালকি গেস্ট হাউসে। রুমে প্রবেশ করেই ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার সারলাম সামনের গ্রীন হোটেলে। খেয়েই চাদের গাড়ী ঠিক করে রওনা হলাম ঐতিহাসিক স্বর্ণ মন্দির দর্শনে।

মন্দিরে উঠতেই বাধল বিপক্তি সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা আছে, ‘থ্রি কোয়ার্টার ও হাফ প্যান্ট পরিধান করে মন্দিরে প্রবেশ করবেন না, এছাড়া রয়েছে আরো নানা শর্তাবলী। যার কারনে মোরশেদ হোসেন আর সুমন ভাইরা উঠতে পারলেই মন্দির ভ্রমন জলে গেলো আমি আক্কাসসহ কয়েকজনের। মজার বিষয় হলো মন্দিরে উঠতে গিয়ে অনেকাংশে পেট কমে গেলো মোরশেদ ও আনোয়ার ইমরান ভাইয়ের। মন্দির দর্শন করতে না পারার কষ্টে রওনা দিলাম নীলাচল। উঁচু উঁচু পাহাড় বেয়ে দুই পাশে সবুজ নগর অতিক্রম করে উঠতে লাগল গাড়ী। সামনে বসেই অস্থির মোরশেদ ভাই বান্ধবী রোজের সন্ধানে। কতটুকু উঠতেই ৬০ টাকা টোল ফ্রি দিয়ে গাড়ীর গতি বাড়িয়ে উঠতেই লাগল নীল আকাশের মেঘ ছুঁতে। গাড়ি থামল নীলাচলের প্রবশ মুখের গেইটেই। নামতেই চোখে পড়ল পুরো বান্দরবানের মানচিত্র। কি অপরুপ স্রষ্টার সৃষ্টি।
উপরে উঠেই নিচে তাকাতেই মনে হলো এ কোথায় এসে উঠলাম। যেন অাকাশের সাথে মিতালী বেধে স্থলভূমি দেখা। নীলাচলের বাঁশের তৈরি ব্যালকনী, ছাতা ও সিঁড়িতে বসেই উপভোগ করা যাবে প্রাকৃতিক লীলাভূমি বান্দবানের অপরুপ দৃশ্য। যা মন কেড়ে নেবে প্রকৃতি প্রেমীদের। শীতল হাওয়ায় নীরব পরিবেশে মনে হবে যেন স্বর্গে বসবাস করছি। এছাড়া আরো উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই দেখা যাবে বান্দরবান শহরটাকে। সাথে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে উঠা আদিবাসীপাড়াগুলো। নীলাচলের পর দর্শনীয় স্থান হতে পারে রুপালী ঝর্না। রওনা হলো ঝর্নার তরে, গাড়ি থামতেই দৌড়ে আসল একঝাক বাঙালী শিশু। তাদেরই একজনের নাম নাঈমা। বয়স বেশিদূর ৭ হবে, জিজ্ঞেস করতেই বলল, “আমাদের বাড়ি সাতকানিয়া বাজালিয়া, আমরা এখানেই থাকি, স্কুল থেকে এসেই ঝর্নায় আসা লোকদের তা দেখিয়ে দি আমরা। বিনিময়ে খুশি হয়ে কিছু দেয়।” কত পাও জানতে চাইলে বলল দিনে ১০০/১৫০ টাকা।
ঝর্নায় গিয়ে দেখা মিলল আরো অনেক পর্যটকের। যারা প্রথমবারের মতো আসছে দেখতে এ ঝর্না। আমাদের গ্রুপের সবাই প্রস্তুত হলো ঝরনায় নামার জন্য, নামলও সবাই, কয়েকজন তো উপরেই উঠে গেল। তাদের দেখে উঠে গেলাম আমরা আরো কয়েকজন। সৃষ্টি হলো নতুন অভিজ্ঞতার, তা হলো পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে গিয়ে অনেক সময় কাজ পাহাড়ী লতাপাতার গাছগুলো। সেইগুলো হাতিয়ার করে উঠে গেলাম দূর পাহাড়ের চূড়ায়। ঝর্নায় থাকতেই সূর্য্য মামা বাড়ি ফিরল, আমাদেরও ফিরতে হবে। তাই নেমেই সবাই বৃষ্টি আর সূর্যি মামার সাথে পৌঁছে গেলাম হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে রাতে দর্শন করলাম ঐতিহাসিক রাজবাড়ী, বান্দরবান প্রেসক্লাবসহ আদিবাসীদের দোকানগুলো।

রাতেই ঘুমাতে গিয়ে মনে হলো ভোরটা কখন হবে, কখন যাবো নীলগিরি। ঘুমাতেই দেখি সুমন শাহ’র ডাক। ঘড়ি দেখি সকাল ৫টা। ফ্রেশ হয়ে সবাই ভোরেই রওনা হলাম নীলগিরি দর্শনে। বান্দরবান-থানছি রোড় ধরে গাড়ি চলছে নীলগিরির উদ্যেশ্যে, পথে চোখে পড়ল, শৈলপ্রপাত ঝরনা, বম আদিবাসীদেও কয়েকটা পাড়া ও চিম্বুক পাহাড়। শৈলপ্রপাত থেকে দুইঘন্টার পথ চিম্বুক পাহাড়। চিম্বুক পাহাড় থেকে ঘন্টাখানেক রাস্তা পার হতেই দেখা গেল আকাশের সাথে মিতালী পাতা নীলগিরি। সেখানেই গিয়ে থামল গাড়ী। নীলগিরি উঠতেই হাতের কাছে নীল আকাশের মেঘগুলো হেটে চলছে তার মহিমায়। অপরুপ সুন্দরের হাতছানী দিয়ে আছে রুপকন্যা নীলগিরি। হাতের তালুতে মেঘ নিয়ে আকাশ ছুয়ে রওনা হলাম চিম্বুক পাহাড়ে। সাথে আড্ডা আর চায়ের আপ্যায়ন করালো এব বম অদিবাসী। বলল তাদের পাহাড়ি জীবন কাহিনী। সারি সারি বসে আছে নিজ হাতে তৈরি তাতের কাপড় নিয়ে। চিম্বুক পাহাড় শেষ করে রওনা হলাম শৈলপ্রপাত ঝরনায়। গিয়ে দু’দিনের ক্লান্তি শেষ হলো শৈলপ্রপাতে গা ভাসিয়ে গোসল সেরে। আকাশে পূর্ণ চাঁদ, পাহাড়ের চ’ড়াই ছোট্ট ঘরের আলোর রোশনি, সেই আলোর আভায় আশেপাশের সবুজ গাছপালায় ভরে উঠা পূর্ণিমায় সময়টা কাটাতে চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন রুপকন্যা বান্দরবানে…

ইমরান এমি
লেখক ও সাংবাদিক, চট্টগ্রাম

Share Button