বিজয়ের হৃৎ-স্পন্দন।। বিশেষ সংখ্যা

শনিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
Share Button

স্মৃতি-৭১।। সেবক বিশ্বাস

একাত্তর!
তুমি ফিরে আসো বারবার বিজয়ের স্মৃতি নিয়ে,
স্মৃতি নিয়ে রক্তের,
সংগ্রামের,স্বাধীনতার।
আমি যুদ্ধ দেখিনি একাত্তর,
মায়ের কাছে শুনেছি তোমার গল্প-
ওরা নাকি পাখির মতো মেরেছে মানুষ লাখে লাখে,
খড়ের মতো জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘর।
বাংলা দেখেছে পাক-পশুতা
বনের পশুর চেয়ে।
একাত্তর!
তুমি এলে দেখি
গীটার হাতে গাইছে হ্যারিসন-
বাংলাদেশ!
বাংলাদেশ!
রবিশঙ্কর রোদন তুলছে সেতারের তারে তারে।
তুমি এলে শুনি মুক্তির গান,
শ্লোগান, কবিতা, চরমপত্র
প্রিয় স্বাধীন বাংলাবেতার কেন্দ্রে।
তুমি এলে দেখি-
ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক
ঝাঁপিয়ে পড়েছে যুদ্ধে;
তুমি এলে আবার এও যে দেখি-
পশুদের সাথে লেহনে নেমেছে
বাংলার আলোবাতাসে বাড়া
জটিল জীবন্তক।
হে একাত্তর!
তুমি আসো আর দিব্যচোখে দেখি-
দিকবিদিক, অজানাঅচেনায় ছুটে চলা সব মানুষ-
পিঁপড়ে-সারির মতো।
মাথায় মঞ্জুষা, সন্তান কোলে,
অচল বৃদ্ধ,
অন্ধ বৃদ্ধা অবাক পৃথিবীর পথে!
লাখো লাখো চোখ
তবু আতঙ্ক,
লাখো মুখ তবু
মৃত্যুর বিভীষিকা।
একাত্তর!
তুমি এলেই শুনি যেন
মিলিটারি গাড়ির আওয়াজ,
রাত ছিঁড়ে যাওয়া ভীষশ বুটের শব্দ,
হঠাৎ
মুহুর্মুহু গুলি, তীব্র আর্তনাদ,
বাতাসে ভেসে যাওয়া অস্ফুট গোঙানি।
কখনো বা শুনি
শ্মশান বাংলার নিঃস্তব্ধ মৃত গান।
তুমি এলে
আমি দেখতে পাই
শরণার্থীশিবিরে মানুষের
স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই,
দুগ্ধহীন মায়ের কোলে শীর্ণ শিশুর চিৎকার,
দেখি খাদ্যহীন,পুষ্টিহীন মানুষের মরে যাওয়া,
আমি দেখতে পাই তেরেসার জলে ভেজা চোখ,
ইন্দিরার দেবী হয়ে ওঠা,
তুমি এলেই শুনতে পাই
ইয়াহিয়ার মিথ্যাচার,
ভুট্টোর দম্ভোক্তি,
রাজাকারের কদাচার,
আমি দেখি মুজিবের ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠা,
দেখি নগ্নপদে মুক্তিসেনাদের সংগ্রাম,
তুমি এলেই চোখে ভাসে রেসকোর্স ময়দান,
বুকে বাজে ৭ মার্চ,
ঝিলিক চোখে দেখি
নিয়াজীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পন,
তুমি এলেই শুনতে পাই
আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলা
কোটি মানুষের জয়ধ্বনি:
বুঝি,কত প্রাণময়,কত সজীব
স্বাধীন মানুষের হৃৎ-স্পন্দন!

 

তারপর।। মাহমুদ নোমান

কতোদূর এগোলে বাংলাদেশ
নম্বর দাও, মনোলাপ করি

বুকের ডিজিটগুলো খোয়াতে খোয়াতে
মিছে নদীর কূল
হেলান দিয়ে শকুন
ঠুকরাচ্ছে ক্ষত চিহ্ন
এয়ার কন্ডিশনার রুমে,
উত্থিত ভিসিয়ারে লোলুপ মানবতাবাদী
তুমিই বলছো, রাজাকার, রাজাকার !

আমি একাত্তর বলতে বুঝি, এক কেজি
মিনিকেট চালের দর
অনেকে বলাবলি করতে শুনছি
এটা খেয়ে দেহের ভেতর ক্যান্সারপোকা
বাসা বাঁধে –

আমি রাজাকার বলতে বুঝি, চিকিৎসার নামে
ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাঁচের দেয়ালে
ইটের গোপন সুরঙ্গে ,
কাগজের হাজারি নোটের গলাধকরণ

আমি দৌড়াই কখনো মাঠে মাঠে
শীতে পলায়নপর
ফরমালিনে ছেয়ে যায়
আগামীর ভ্রূণ ,
নয়তো মাথার ঘামে ফলানো ফসলের
রাস্তায় দলাদলি

আর কতোটা এগোবে বাংলাদেশ
তুমি তো রাজাকারেরও দেশ
আগে ছিলে মীরজাফরের
তারপর…

 

বিজয় দিনের গান।। শিল্পী কল্যান চন্দ্র শীল

সকাল বেলা দরজা খুলে
বাইরে এলাম বেড়িয়ে,
শিশির ভেজা ঘাসের উপর
একটু খানি দাঁড়িয়ে।

আকাশ পানে চেয়ে দেখি
আলোকিত রবি,
সাত রঙ্গে এঁকেছে যেন
বিজয় দিনের ছবি।

প্রজাপতি নানা রং
এঁকেছে তাঁর অঙ্গে,
মৌমাছিরাও গুণগুনিয়ে
গাইছে তাঁর সঙ্গে।

গাছের ডালে করছে গান
দোয়েল শ্যামা টুনটুনি,
এমনি করে রোজ সকালে
বিজয় দিনের গান শুনি।

 

রক্ত থেকে জন্ম।। মাহবুবা আক্তার স্মৃতি

এখানে কিছু কঙ্কাল পড়ে
শিকড়ের অপেক্ষায় ;
হঠাৎ চোখে পড়ে শ্যামলতায় মোড়ানো এক মাকে,
চোখদুটি বেশ জ্বলজ্বল- সূর্যের মতোন।
পেটের ভিতর একটি ভ্রূণ!
ধীরে_ধীরে_ বেড়ে চলে…
এখানে দীর্ঘশ্বাসেরাও নব শিশুর স্বপ্ন দেখছে,
পা থেকে মাথা পর্যন্ত দৃঢ় অবয়ব,
যদিও জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে নাভিশ্বাস!
তলপেটে কেমন কুণ্ডলী পেকে আছে-
ভয়ঙ্কর লাল!
ভ্রূণের ভিতর আরও_ লাল।
রক্ত!রক্ত! রক্ত ঝরছে ভীষণ!
স্তনের বোটায় দুধ- গড়িয়ে পড়ে মাটিতে,
উর্বর হয় মাটি।
রক্তে সিক্ত নাভিমূল! তবুও
ধীরে.. ধীরে.. বড় হতে থাকে।
গর্ভধারিণী মা,ব্যথায় কাতর।

ভ্রূণটি বেড়ে চলে রক্তিম পথ ধরে,
শ্যামলি মা,রক্ত নহরে সাজে
কিছু আগাছা আর শৈবালের ছোবলে।
এক সময় ভ্রূণটি সোনার বাংলার রূপ নেয়!

দীর্ঘ নয় মাস..হ্যাঁ দীর্ঘ নয় মাস। অপেক্ষা;
প্রসব বেদনা বেড়ে চলে,
হঠাৎ আরও যন্ত্রণা-
একদিন,সময় ঠিক ৩টা!
জন্ম হয় একটি স্বাধীন মানচিত্রের-
নাম ‘বাংলাদেশ ‘।

 

স্বাধীনতার গল্প।। শ্যামলী বিনতে আমজাদ

বারান্দাতে ঝুলছিলো এক
পাখির খাঁচা,
ছটফটিয়ে সেই পাখিটা
বলতো- বাঁচা।

পাখির মত এই জাতিটা
ধৃত ছিলো,
অত্যাচারে ইচ্ছে গুলো
মৃত ছিলো!

সব সুবিধা ঐ পাকি’রা
করতো যে ভোগ,
জুলুমবাজি ছিলো তাদের
রক্তেরই রোগ।

শত্রু বিনাশ করতে হলো
যুদ্ধ শুরু,
প্রাণ হারালো মজুর-কুলি
ছাত্র-গুরু।

লড়াই করে স্বাধীন হল
সোনার এ দেশ,
খাঁচার পাখি উড়ে গেল
গল্পটা শেষ ।

 

রণাঙ্গন থেকে বলছি।। রুমকি আনোয়ার

মৃত্যুর ভয়াল উপত্যাকা আমার দেশ
বাহুতে এল এম জি নিয়ে ঘুরছি বন-বনান্তে,
গতকাল মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে বুলেট
বেঁছে আছি এটাই বিস্ময় ।
যখন ফিরে আসি আপন ঢেরায়
ক্লান্ত, অবিশ্রান্ত দেহটি কেবল মৃত্যু খুঁজে
সঙ্গীরা আজ অনেকই গেছে ঝরে
১৮ বছর বয়সে সাতাশ টা খুন করেছি
সন্তাপ, অভিশাপ, মানবতা খুঁয়ে গেছে।
পাশে সহযোগীরা গোল হয়ে “চরম পত্র” শুনছে
আমি ভাবছি মা’র কথা, বেঁচে আছে তো
শুনেছি পুরো গ্রাম নাকি জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা।
গতকাল স্বপ্ন পুরুষ খালেদ মোশাররফ এসেছিল
পিঠ চাপড়ে বাহাবা দিয়েছে,
“বলেছি ভাত নয়, বুলেট চাই
আমি আরও খুনে হতে চাই ।”
মৃত্যু আমাকে উল্লাস যোগায়, বেঁচে থাকার রসনা
একি মাতৃ জঠরে জন্ম নিয়েও অপাংতেয় হয়ে ছিলাম,
অধিকার কেড়ে নিয়ে গড়েছ বঞ্ছনার ইতিহাস
আমরাও ফিরিয়ে দিব শতগুনে মৃত্যুর দানবীয় উল্লাসে।

 

বিজয়ের সৌরভে।। এবিএম মাহাবুবুল ইসলাম

পিতা হেঁটে যায় ওই জলসবুজের কাঁদামাখা অালপথে।
হেঁটে যায় ওই রক্তাক্ত একাত্তরে।

পিতা হাঁটে শিমুল-জবার রক্তঝরা পথে পথে।
মুক্তির স্বপ্ন হাঁটে তার সাথে।
পিতা হাঁটে কাধে তার স্টেন,
বায়ান্ন হতে একাত্তরের ক্যানভাসে।

পিতা অাসে একটি ফুলের অালোকিত হাসি ফুঁটে অাছে তার মুখে।
পিতা হাসে বিজয়ের সৌরভে
যুদ্ধজয়ের গৌরব অাঁকা তার বুকে।
পিতা অাসে সাতকোটির সুখস্বপ্ন যে তার চোখের তারায় হাসে।

পিতা অাসে অাজ ঝঞ্ঝামূখর শীতের বাতাসে নবান্নের সুখ তাই হৃদয়ে হৃদয়ে হাসে।

 

আমার কোনো আপত্তি নেই।। রাহী চৌধুরী

কারো জন্যে নয়,
একটা নতুন দেশে একটু একটু করে
আলোকিত হবে নতুন ভোর,
তাই হাতে তুলে নিয়েছি রাইফেল,
বেয়োনেটের সাথে করেছি নিবিড় সখ্যতা।
কারো জন্যে নয়,
আকাশের বুকে পাখিগুলো
অবাধ ডানা মেলবে বলে,
বুক পেতেছি কামানের সামনে
সেলের সাথে খেলেছি কাটাকুটি খেলা ।
কারো জন্যে নয়,
বৃষ্টির পর বুনো ঝোপঝারের গাঢ় সবুজে
রোদের সোনালী ছটা দেখবো বলে,
নির্ভয়ে পড়েছি ফাঁসির দড়ি,
হাসি মুখে গ্রেনেড বেঁধেছি বুকে ।
কারো জন্যে নয়
তোমাদের কারো জন্যে নয়,
একটি নিষ্পাপ হাসির পরিবর্তে
আমি বাজি রাখতে পারি সব,
আমি সহ লক্ষ মানুষের প্রাণ,
তারপরেও
যদি জন্ম নেয় একটি নতুন নাম
সৃষ্টি হয় স্বাধীন সত্ত্বার সীমানা,
আমার কোনো আপত্তি নেই ।
আমার কোনো আপত্তি নেই
ঠিকানা যখন হবে গোরস্থান
কবর ফলকে লিখে দিও নাম ।।

 

আমাদের স্বাধীনতা।। অরণ্য আপন

স্বাধীনতা নাম না জানা কোনো পাখি নয় যে
আকাশে উড়তে দেখতে পাবে
স্বাধীনতা কোনো লোহার জিঞ্জিরা নয় যে
অপরাধীর পায়ে বাঁধা দেখবে
স্বাধীনতা কোনো নীল শাড়ি নয় যে
বছরের একদিন পরে প্রিয়জনের সামনে দাঁড়াবে
স্বাধীনতা কোনো প্রেমিকের দেওয়া রেশমি চুড়ি নয় যে
কানের কাছে নিয়ে রিনিঝিনি শব্দ শুনবে
তবে স্বাধীনতা কি
স্বাধীনতা একটা পতাকা?
যার রং সবুজ আর লাল
জাদুঘরে গিয়ে স্বাধীনতা দেখতে হবে আর আমাদের কতকাল
আমাদের প্রশ্নপত্র কতটুকু স্বাধীন
আমাদের সড়কপথ, জলপথ, আকাশপথ কতটুকু স্বাধীন
আমাদের সংস্কৃতি কতটুকু স্বাধীন
আমাদের চিন্তা স্বাধীন?
সব স্বাধীনতা কেন ভর করেছে
চালের দামে
পেঁয়াজের দামে
বিদ্যুতের দামে
আমাদের স্কুলমাঠ, নদীরঘাট কি স্বাধীন
স্বাধীন কি আমাদের ভার্সিটির হল
স্বাধীন কি চাকরির পরীক্ষার ফল
আমাদের ভোট, কলমের ঠোঁট কতটুকু স্বাধীন
আমাদের জন্ম স্বাধীন, আমাদের মৃত্যু কতটুকু স্বাধীন
আমার নিরু কি স্বাধীন
আমাদের স্বাধীনতা কতটুকু স্বাধীন।

Share Button