মেলা।। সঞ্জয় চ্যাটার্জী।। ঈদ সংখ্যা ২০১৮

শনিবার, জুন ১৬, ২০১৮ ১২:২১ অপরাহ্ণ
Share Button

অনেকদিন মেলা দেখা হয় নি। সেদিন চোখে পড়ল পার্শ্ববর্তী স্টেশনে মেলা বসেছে। উৎসুক হয়ে গেলাম মেলা দেখতে। গিয়ে দেখি ভিড় যেন উপছে পড়ছে; গ্রামীণ কারুকাজ, বাচ্চাদের রকমারি খেলনা, বেতের ঝুড়ি, মোড়া, আরামকেদারা, নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী, হাতা- খুন্তি- হাঁড়ি – কড়াই – ছুরি-কাঁচি- বঁটি, ইত্যাদি নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন কুঠির শিল্পীরা। হরেক রকম দোকান কোনোটা খাবারের, কোনোটা বস্ত্রের। বিছানার সুন্দর সুন্দর চাদর, ঘর সাজাবার বিভিন্ন সামগ্রী- সৌখিন ফোটোফ্রেম, বড় বড় মনীষী – চিত্র তারকা- খেলোয়াড়দের ছবি, দামী গালিচা, মাটির রকমারি পুতুল ইত্যাদির ঠাসা উপকরণে বেশ সেজেছে মেলা। বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, ম্যাজিক শো, বেলুন ফাটানো, নানান সামগ্রীর লটারি এসবেতে বেশ জমকালো মেলার চেহারা। সেই সঙ্গে আছে পুষ্প প্রদর্শনী, বাঁদর খেলা। কোথাও বা চলছে লোক নাট্য, গণসঙ্গীত। ঘুরতে ঘুরতে বেশ উপভোগ করছি মেলার দৃশ্য। অনেকদিন পর এমন মেলা দেখার সুযোগ হলো।

হঠাৎ দেখি এক জায়গায় লেখা, কবিতা প্রদর্শনী। কবিতা প্রদর্শনী? সেটা আবার কি? এমন তো কখনো শুনিনি আগে? চিত্র প্রদর্শনী, স্থাপত্যকলা প্রদর্শনী, পুষ্প প্রদশনী -এই সবই তো দেখেছি বা শুনেছি ! বেশ আগ্রহভরে এগিয়ে গেলাম, দেখি তো ব্যাপারটা কি ! গিয়ে দেখি, বড় বড় বাঙালি কবিরা তাঁদের কবিতা সম্ভার নিয়ে সেখানে উপস্থিত। ভিড় প্রচুর; মিডিয়া, ক্যামেরা, টিভির চেনা পরিচিত সংবাদ চ্যানেলগুলো ঘিরে রয়েছে কবিদের। চলছে কবিদের কবিতা পাঠ, শ্রতাবৃন্দরা নিচ্ছেন অটোগ্রাফ, বই কিনছেন হুমড়ি খেয়ে। শুধু এক কোণে একজন পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ভালো করে ঠাওর হয় না দূর থেকে। তবে পোশাকে তাঁর কিছুটা অমলিনতার ছাপ, মুখে বেশ কিছুদিনের শেভ না করা দাড়ি। কবি বলেই মনে হয়, তবে কেউ তাঁকে কিছুই জিজ্ঞাসা করছে না। কিনছেও না তাঁর কোনো বই, কবিতা পাঠেরও কোনো অনুরোধ আসছে না। মনে হ’ল তিনি হয়ত গণ্যমান্য কেউ নন। ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম তাঁর কাছে। তিনি সহাস্যে আমায় নমস্কার জানালেন, আমিও প্রতি নমস্কার জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-স্যার, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না !
-আমি, বটেশ্বর আঢ্য।
-ও আচ্ছা। আপনি কি কবি?
-হ্যাঁঁ, বলতে পারেন। কিছু কবিতা লিখেছি আমিও।
-তাই? তা, এই এত ভিড়ের মাঝে আপনি চুপচাপ বসে আছেন যে? আপনাকে কেউ কিছু বলছে না তো?”

কবি একটু মুচকি হাসলেন। আমি হতভম্ব হলাম তাঁর এই হাসিতে। বললাম, “যদিও আমি বিশেষ পড়ুয়া নই আর কবিতা তেমন কিছুই বুঝি না, তবু যদি আপনার একটি লেখা পড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করি, আপনি কি দেবেন পড়তে?”
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয় ! আপনি পড়ুন না !
এই বলে কবি বটেশ্বর আঢ্য আমাকে তাঁর একটি বই এগিয়ে দিলেন। আমি পড়তে লাগলাম। বেশ কয়েকটা কবিতা পড়ে বিমুগ্ধ হয়ে চাইলাম কবির দিকে। বললাম,
-সাধু, ধন্য আপনি কবিবর ! এত আপনার মহান সৃষ্টি ! যতই পড়ছি ততই পড়ার ইচ্ছে আমায় পেয়ে বসছে।
-তাই?
-আমি বইটা কিনব স্যার।
উনি করজোড়ে আমার দিকে চেয়ে মুখ কাচুমাচু করে বললেন,
-এটা বলে আমায় লজ্জা আর দেবেন না স্যার !
আমি ইতস্তত করে বললাম,
-কিন্তু এ তো আপনি বিক্রির জন্য রেখেছেন ! আর আপনি আমায় স্যার-ই বা বলছেন কেন? আমি নিতান্তই সামান্য একজন পাঠক।
কবি বটেশ্বর আঢ্য আমার কাছে এগিয়ে এসে ফট করে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললেন,
-স্যার, আপনি নিজের পরিচয় যতই গোপন রাখুন না কেন, আমি আপনাকে ঠিকই চিনেছি।
মুখ কাচুমাচু করে আমি বললাম,
-আজ্ঞে?

বটেশ্বর বাবু হঠাৎ কঁকিয়ে কেঁদে আমার পা দুটো ধরে নতজানু হয়ে বললেন,
-আজ্ঞে স্যার, আমায় আপনি ক্ষমা করে দিন ! আমি আপনার অপরাধী ! আমিই আপনার সমস্ত স্ক্রিপ্টগুলো চুরি করে পালিয়ে এসে ছদ্মবেশে নাম ভাঙিয়ে বই ছাপিয়েছি স্যার ! আসল কবি তো আপনি নিজেই স্যার !

আমি চমকে উঠলাম !
-তুমি বৈকুন্ঠ না? বৈকুন্ঠ সমাদ্দার তো?
সে বলল,
-আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার !
-হ্যাঁ, হ্যাঁ ! চিনতে পেরেছি এবার। তাহলে তুমিই চুরি করেছিলে আমার লেখাগুলো?
বৈকুন্ঠ নত মুখে মাথা নেড়ে সায় দিল।
-তা, এ কাজ তুমি কেন করলে? আর এ কী চেহারার হাল হয়েছে তোমার?
-হিংসায় আর পেটের দায়ে স্যার !
-কিসের হিংসা?
-আপনাকে হিংসা করে স্যার ! আপনার মত কবিতা লিখতে পারতাম না বলে খুব হিংসা হত আমার আপনার প্রতি। সেই সঙ্গে ঘরে তখন অসার হাল। কেরানির চাকরি করে ক টাকা আর উপার্জন করতাম তখন ! ঘরে দু দুটো বাচ্চা, তার ওপর স্ত্রী তখন আবার গর্ভবতী। কোলের ছেলেগুলোকেই ঠিক মত আহার জোগাতে পারি না। ভাবলাম আপনার লেখাগুলো চুরি করে নিজের নামে ছেপে একবার বের করতে পারলেই আর আমায় দেখে কে! তাই একদিন সুযোগ বুঝে আপনার ঘরে ঢুকে সব স্ক্রিপ্টগুলো নিয়ে পালাই ! আপনি আমায় পুলিশে দিন স্যার! আমার এই অপরাধের জন্য নরকেও ঠাঁই হবে না আমার!

শুনে তো আমি এক্কেবারে থ! খানিকক্ষণ চুপ করে পুরনো স্মৃতি ঘাঁটার চেষ্টা করলাম। সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন পূর্ণোদ্যমে আমি লিখতাম। মনের ভেতর কবি হয়ে ওঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। চারিদিকে বেশ একটু নাম হচ্ছিল। কিছু বই বের করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে দিনরাত এক করে লিখছিলাম। হঠাৎ সেই লেখাগুলো একদিন হারিয়ে যায়, বহু খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। আর, আমার কবি হয়ে ওঠার স্বপ্নও চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেলো। আজ বইটা পড়তে পড়তে একটু খটকা লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু প্রকাশ করতে পারি নি। ভীষণ রাগ হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল সবার সামনে ঐ চোরটার চরিত্রটাকে নগ্ন করে দিই। কিন্তু রাগ দমিয়ে মন সংযত করলাম শেষ পর্যন্ত। জিজ্ঞেস করলাম,
-এখন তোমার পারিবারিক অবস্থা কেমন?
-ভালো নয় স্যার ! বড় ছেলের কলেজে অ্যাডমিশন ফী দিতে পারছি না। ছোটটাকে হয়তো আর পড়াতে পারবো না। স্ত্রীর বাঁ দিক পঙ্গু। ওষুধ কেনার টাকা নেই। মেয়েটার লেখাপড়া তো হলই না। সংসারের সব ভার তো ওরই কাঁধে ! ধারদেনায় মাথা বিকিয়ে গেছে। মাঝেমাঝে মনে হয় আত্মহত্যা করি। কিন্তু আমি চলে গেলে ওরা পথে ভাসবে !

বৈকুন্ঠ এবার কেঁদে ফেলল। ওর কথা শুনে বড় মায়া লাগলো, ভাবলাম ওর কোনো দোষ নেই। যার কাঁধে সংসারের সমস্ত দায় দায়িত্ব আর পকেট গড়ের মাঠ, সে চুরি করবে না তো কি করবে ! পকেটে কিছু টাকা ছিল, বের করে ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম,
– এটা রাখো। আর দ্যাখো, বইগুলো যদি বিক্রি করতে পারো। তাহলে তোমার কোনো সুরাহা হতে পারে।
বৈকুন্ঠ ইতস্তত করতে লাগলো, বলল,
-না না স্যার ! তা কি করে হয় ! আমি নকল কবি ! আপনি আসল, আজও আপনার নাম শুনলে ওরা এসে ছেঁকে ধরবে আপনাকে। আমি এখনি ওদের ডাকছি।
এই বলেই সে প্রেস ডাকতে উদ্যত হল। আমি খপ করে তার হাত ধরে তাকে থামিয়ে বললাম,
-করছো কি? লোকে আমাকে ভুলে গেছে, সৌমদীপ রায় ইজ নট একজিস্ট এন্নিমোর। আর চাইলে আমি আবার পরে বই বের করতে পারবো। কিন্তু তোমাকে ওরা কবি বটেশ্বর আঢ্য হিসেবে প্রদর্শনীতে স্থান দিয়েছে। তুমি স্বচ্ছন্দে এখানে বই বিক্রি করো। মনে করো আমার সাথে তোমার দেখাই হয় নি।

সে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। বললাম,
-কি হ’ল? অমন হাঁ করে কি দেখছ? যা বলছি তাই করো।
-স্যার ! আপনি ধন্য !
বলে সে আবার আমায় প্রণাম করলো। আমি মুচকি হেসে বললাম,
-ভালো থেকো, এখন চলি। পরে দেখা করো কেমন।

মনে একটা প্রশান্তি জেগে উঠলো। নিজের মনেই হাসতে হাসতে মেলা ছেড়ে বেড়িয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।

Share Button

One thought on “মেলা।। সঞ্জয় চ্যাটার্জী।। ঈদ সংখ্যা ২০১৮

আপনার মতামত দিন