শুধু মুখে নয়; দায়িত্বতার সহিত বাস্তব চর্চার মধ্যেই প্রকৃত বিজয় নিহিত

শনিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ ১০:৩২ অপরাহ্ণ
Share Button
  •  মাহবুবা আক্তার স্মৃতি

“বিজয় আমার অহংকার
বিজয় আমার গর্ব,
এই বিজয়’ই আমার মাতৃভাষা –
রক্তে লিখে যাওয়া স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ!!!…. কবিতার এই কয়েকটা লাইন লেখার পরপর’ই কলমটা আটকে গেল। ভাবছি অনেককিছুই। স্বাধীনতার ৪৬বছর পেরিয়ে আমরা কি পেয়েছি বা আমরাই দেশের জন্য কতটুকু করতে পেরেছি!
আজ মহান “বিজয় দিবস”। সারা বাংলাদেশ’ই বর্ণীল রঙে সেজেছে, তার ছোঁয়া আমার প্রিয় ক্যাম্পাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও স্পষ্টভাবেই সবার চোখে পড়ছে। রোকেয়া হলে থেকেও আমি বাইরে বিজয়ের উল্লাস বেশ ভালোভাবেই শুনতে পাচ্ছি। বেশ পুলকিত বোধ করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ’ই মনে হলো, এই যে এতো উল্লাস,১৬ডিসেম্বরকে নিয়ে এতো আলোচনা, এতো আয়োজন…..তা আর কতক্ষণ? আমি জানি, দিন ফুরিয়ে রাত হবার পূর্বেই সবাই সব ভুলে যাবে, ব্যস্ত হয়ে পড়বে যার যার কর্মস্থলে। ভুলে যাবে ১৬তারিখ আয়োজনের কথা, ভুলে যাবে কিছুক্ষণ আগে বলা কথাগুলো, প্রতিশ্রুতিপত্র, ভুলবে অতীত যত ইতিহাস।আমি নিজেও তার বাইরে নই।আমি,আপনি প্রায় সবাই রয়েছি এই দলে।কেননা,আমরা আজ ছুটছি জীবিকার তাগিদে,জীবনের টানে। “এইসব অতীত ইতিহাস আমাদের কিচ্ছু দেয়না,”–বেশিরভাগ খেটে খাওয়া মানুষের কথা।যার ফলে আমরা সবাই উদাসীন হয়ে গেছি সবকিছুতে।দেশের কথা ভাবার মতো মন-মানসিকতা এখনো আমাদের গড়ে উঠেনি।কবে হবে,তাও জানা নেই…..
তবে আমরা তো ব্যস্ততার কারণে কিংবা নিজ স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে সারাবছর এদেশের অতীত ইতিহাস কিংবা গৌরবময় রক্তমাখা ইতিহাসের কথা ভুলে গেলেও বিশেষ দিনগুলোতে অল্প সময়ের জন্য হলেও মনে করি, স্মরণ করি সেইসব শহীদদের,যারা এদেশের জন্য,মানুষের জন্য,প্রিয় মাটি আর প্রিয় মানুষগুলো আর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জালিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল,রক্ষা করেছিল সেইসব শাসকদের বিরুদ্ধে,যারা পূর্ব পাকিস্তানে(পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশ) শাসনের নামে শোষণ,অন্যায়-নির্যাতন আর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মতো কিছু কালো অধ্যায়ের সূচনা করেছিল!কি করেনি পশ্চিম পাকিস্তান? রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক… প্রায় সবক্ষেত্রেই তো ওরা আমাদের ঠকিয়েছে,বঞ্চিত করেছে ন্যায্য অধিকার থেকে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রায় সবশ্রেণীর মানুষ’ই মুক্তির সংগ্রামে প্রাণকে বাজী রেখে যুদ্ধে গিয়েছিল। যদি বছরের একটা দিনও তাদের স্মরণ করে এতো আয়োজন করা হয় মন্দ কি?
আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন,এ আর এমন কি কথা? শুধু শুধু সময় নষ্ট।সবই পুরনো কথা!! হা ভাই,পুরনো কথা; তবে সূর্যের মতো সত্য।
সূর্যের মতো সত্য আরেকট বিষয়,তা হল স্বাধীনতার ৪৬বছর পেরুতে না পেরুতে আমরা যেখানে মুক্তিযুদ্ধ কে ভুলতে বসেছি,অনেকেই জানিনা তার সঠিক ইতিহাস, মানিনা অনেককিছুই, একটা নির্দিষ্ট দিন ছাড়া বাকি দিনগুলো আমাদের কাছে তুচ্ছ, ভুলেও স্মরণ করতে ভুলে যাই মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কি অবস্থা হবে বুঝতে পারছেন?? তখন হয়তো মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ থাকবেনা, ইতিহাস কোনো ইতিহাস থাকবেনা, সব পড়ে থাকবে, ফ্যাকাসে হবে, উদ্ধার করার মতোই তখন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা….।
আচ্ছা, তখন আমাদের দেশ আমাদের থাকবে তো? নাকি…..। কবরে থাকা শহীদরা হয়তো ঠুকরে কেঁদে উঠবেন তখন। হয়তো আবারো রক্তাক্ত শরীর নিয়েই জেগে উঠে ঘোষণা করবেন, সেইসব কুলাঙ্গারদের বিরুদ্ধে, যারা এদেশ, এদেশের মানুষ, এদেশের রক্তাক্ত ইতিহাসকে ভুলে গেছে বা ভুলতে বসেছে। মাঝে মাঝে ভাবি, বর্তমানে অনেকেই (অনেক শিক্ষিত শ্রেণীর লোকও আছে) একাত্তরের ঘটনা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নন,তখন কেমন লাগে? শহীদ যাঁরা হয়েছেন, তাদের নিশ্চয় হৃদয় তখন ব্যথায় ভরে উঠে,হয়তো কেউ কেউ কেঁদে বলেই ফেলে,”এদের জন্য কি জীবন দিয়েছিলাম? “অনেক শহীদ হয়তো উত্তর দেয় “চলো যুদ্ধ করি।”….কি করুণ অবস্থা!!তাইনা?যুদ্ধ করেছেন, এমন যাঁরা কয়েকজন জীবিত আছেন, তাদের কষ্ট গুলো কেন জানি দূর থেকেই স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যায়, শুনতে পাই ভিতরের চেপে থাকা চিৎকার। কাছে যাইনা, ভয় করে।হয়তো সহ্য করতে পারবোনা। কেননা এখুনি যখন বিভিন্ন মাধ্যমে দেখি, বিজয় দিবস,শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস,
একুশ…সম্পর্কে অনেকেই ভুল উত্তর দেয় কষ্ট তো পাওয়ারই কথা। আচ্ছা, অন্যের দোষ তো ধরছি,আমি নিজেই বা কতটুকু জানি? কিংবা যতটুকুই জানি, আমি কি পারবো আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সবটা পৌছিয়ে দিতে? আমার দেশ, রাষ্ট্র, আমার সমাজ, আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়…সবার উপরে আমার পরিবার আমাকে
আপনাকে কতটুকু ধারণা দিতে পেরেছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে? পেরেছে কি?
ভাবতে হবেনা, আমিই বলছি।না,পুরোটা দেয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে যদি আমার আগ্রহ’ই না থাকে,তবে তো আরো সম্ভব নয়। আসলে আমাদের আগ্রহ’ই নেই। কারণ ‘এইসব ইতিহাস কি আমাদের খাওয়াবে?’…এটাই তো আমাদের কথা, তাইনা?আমরা বাঙালি বটে,তবে প্রকৃত হতে হলে সারাজীবন পরিশ্রম করলেও হতে পারবো কিনা..জানিনা। কারন, কালজয়ীরা এতো জন্মায়না। থাক, আপনাদের এখন ভাবার দরকার নেই, কালজয়ী কিভাবে হওয়া যায়। তারচেয়ে বরং আমরা ঋণ থেকে কিভাবে মুক্ত হতে পারি..সেটা নিয়ে ভাবি। কেননা ১৯৭১সালে যাঁরা এদেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, এবং শহীদ হয়েছেন…যাঁরা তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনে বিশ্বের বুকে ‘বাংলাদেশ ‘নামক মানচিত্রের নাম বসাতে পেরেছেন, তাদের কাছে তো আমরা বহু ঋণী, তাইনা? তাদের ত্যাগের ভিতর দিয়েই তো আমরা আয়েশ করে জীবন-যাপন করছি।সেক্ষেত্রে আমাদের তো কিছু দায়িত্ব আছে, যা সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে হয়তো কিছুটা লাঘব হতে পারবো ঋণ থেকে।
কিন্তু বর্তমান মিডিয়া, বিদেশি সংস্কৃতির প্রচুর প্রভাব, রাষ্ট্র, সংবাদপত্র প্রচারণার সঠিক অভাব, বাস্তবায়নের দীর্ঘশ্বাস, সঠিক ইতিহাস চর্চার অভাব, শিশুদের সঠিক ইতিহাস ভালোভাবে না জানানো, ইংরেজি শিক্ষার দারুণ প্রভাব, প্রবাসী জীবনের প্রতি ঝুঁকে যাওয়া….ইত্যাদি আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে দিন দিন। এর জন্য,রাষ্ট্র, সমাজ,পরিবার, পারিপার্শ্বিক অবস্থা,১শিক্ষা ব্যবস্থা, ইতিহাস বিষয়ক জাদুঘর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল গুলোতেও সঠিকভাবে না থাকা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, এদেশের সংস্কৃতি চর্চার অভাবকে অনেকভাবে দায়ী করা যেমন সমীচীন হবে,তেমনি আমরা কতটুকু ভালোভাবে গ্রহণ করছি,আমরা কিভাবে নিচ্ছি, আমাদের মন-মানসিকতা এখানে কতোটা উন্মোখ…আমরা কি ভাবছি, সেটার উপর নির্ভর করে আমাদেরকেও অনেকাংশে দায়ী করা ভুল হবেনা। অস্বীকার করার কিছু নেই, এদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থার কথা চিন্তা করে অনেকেই আমরা যেমন বিদেশ গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের চিন্তা করি,আবার আমাদের ছেলেমেয়েদের দেশের বাইরে পড়াবার জন্যও মন হয়তো অনেকেই স্থির করে রেখেছি।অনেকে পড়াচ্ছেন ও…
কিন্তু এর বিরূপ প্রভাব কি আমাদের চোখে পড়ছেনা?আমাদের কি উচিত না, এখুনি কিছু করা? কেন আমরা জোর গলায় কিছু বলে সেটা পরে ভুলে যাই?এতো দায়িত্বজ্ঞানহীন
তা কেন আমাদের? যেসব কারণে আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল রক্তাক্ত ইতিহাস ভুলতে বসেছি,কিংবা যাদের কাছে ইতিহাস এখনো সঠিকভাবে পৌছাতে পারেনি…এ দায় কার? শুধু কি রাষ্ট্র কিংবা সমাজের?আমাদের কি দায় নেই?আমরা কি সত্যিই পারবো আমাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে?”বিবেক তুমি মরবে কত?
এখনো কি হয়নি সময় জাগার?
দেখো কতোটা স্তিমিত,ম্রিয়মাণ আলো
সূর্যসন্তান তুমি ফিরিয়ে দাও আবার!!”….আমরা হয়তো সূর্যসন্তান পুরোপুরি হতে পারবোনা,নক্ষত্র হয়েই না হয় দেখাবো।কিন্তু সেজন্য তো কিছু ভালো কিছু করা চাই,তাইনা?
চলুননা, আমরা আমাদের দায়িত্বগুলো একটু ভালোভাবে পালন করার চেষ্টা করি।মুখে নয়, বলার পরপর সেভাবে কাজ করতে পারলেই তবে প্রকৃত বিজয় আমরা দেখতে পাবো।এই দেশটা তো আমাদের, আমরা যদি ভালো না চাই, কে চাইবে তাহলে?কেউনা। আমাদের দেশের কথা,আমাদের’ই ভাবতে হবে।যদি প্রত্যেকটা মানুষ নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তার কর্তব্যগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করে,তাহলে খুব বেশিদিন লাগবেনা, এদেশ সোনার বাংলায় পরিণত হতে। যারা আমাদের উপহাস করে, তারাই একদিন হয়তো সবাইকে ডেকে এই ৫৬ হাজার বর্গমাইল ছোট্ট দেশটার গল্প করে…ভাবতে পারছেন?কেমন হবে? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সঠিক ইতিহাস পৌছে দেয়ার দায়িত্ব আমার, আপনার, সকলের। আসুন,নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আমরা আমাদের কাজগুলো সঠিকভাবে পালন করি, দেশকে ভালোকিছু উপহার দেই, তবে যদি কিছুটা ঋণমুক্ত হওয়া যায়..।
সবাইকে বিজয় দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা….

 

৩য় বর্ষ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্বৃতি বিভাগ ;ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়?

Share Button