সময়তাড়িত শৈল্পিক যন্ত্রণার কবি।। মাহমুদ নোমান

সোমবার, নভেম্বর ২০, ২০১৭ ৫:৩১ অপরাহ্ণ
Share Button

কবি সেবক বিশ্বাসের প্রাত্যহিক জীবনের সামূহিক দলিল কবিমানসে গড়ে উঠেছে সময়তাড়িত শৈল্পিক যন্ত্রণায় ” ভাঙা বেহালার অন্ধকার” বইটির কবিতার পর কবিতায়। স্বীকারোক্তি ও আত্মগ্লানি তাঁর কবিতার অন্যতম ভঙ্গি। তবে বৈজ্ঞানিক চেতনালব্ধ অভিজ্ঞতা জীবনদ্রষ্টা কবিকে কখনো – কখনো স্বীয় চরিত্রের অধিক মহিমায় উত্তীর্ণ করে শুধুও না, নিজস্ব ভুবনে নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। কবি সেবক বিশ্বাস প্রেমের ক্ষেত্রে রক্ষণাত্মক, কেবল হতাশার বটবৃক্ষের মতো ছড়ানো কবিতার ভাবধারায় প্রেম অজানা গহ্বরে লুকায়িত। শূন্যতার পথে আসা- যাওয়া এই কবিমানস গদ্যছন্দে সাবলীলতায় সুখপাঠ্য ; হয়তো বিষয়- প্রকরণে তেমন ভিন্নতা নেই। আবার একেবারে আনুনিও লাগবে না এই সব কবিতার স্বাদে। কেবল একটা আলাদা ঘোরের কুয়াশার দেয়াল তৈরি করে –
রাত্রির নিঃশব্দতায় ছুটে চলা কালস্রোতে
আমি অনন্ত প্রাণের এক অবিনশ্বর স্পন্দন
আমি এক অবিনশ্বর স্পন্দন ; ৯ পৃ.)

সত্যিই, কবির মৃত্যু নেই। আসলে স্রষ্টার মৃত্যু কখনো হয় না। স্বাপ্নিক ভাবের বিভ্রমে রেখে চলে স্মৃতি চিহ্ন পঙক্তির পর পঙক্তিতে,হৃদয়ে এক প্রাচীন আকুতি-
একটা মুখের অভাবে
ঠাণ্ডা বুকে জমা হয় রক্তহ্রদ!
– বৃক্ষ ; ১১পৃ.)
নন্দনতত্ত্বের অলংকারশাস্ত্রে রূপক একটি প্রাথমিক ও প্রভাবশালী অলংকার। বৈসাদৃশ্য সত্ত্বেও একটি বস্তু বা ভাবকে আরেকটি বস্তুর প্রতিতুলনায় অস্তিত্ববান করে তোলাই রূপকের কাজ। দুটি আলাদা বস্তুর মধ্যে সম্বন্ধবাচকতা তৈরির এ ধারাতে প্রতিস্থাপিত বস্তুটিরও একটি অর্থ তৈরি মানে ওর অবস্থানের বৈধতা আসে আর অনবরত এ কাজ চলতে থাকে। এভাবেই তৈরি হয় রূপক সাম্রাজ্য। এ সাম্রাজ্যে কবিরা রাজত্বে করে,কবিতা শাসন কায়েম করে। আর এ সাম্রাজ্যে কবি সেবক বিশ্বাস আত্মবিশ্বাসের সাথে কবিতা লিখে যান এটাই মহৎ গুণ-

হেমন্তের ধানে শুয়ে থাকা ক্লান্ত কুয়াশার মতো
সাদা সাদা নিঃস্তব্ধ স্মৃতি
মিশে যায় বুকের অবারিত মাঠে!
জল পড়ে ভিতর পাতায়!
উদম মাটির শরীর জুড়ে অকস্মাৎ
অস্ফুট হাসে অজস্র অপ্রকাশিত কবিতা।
বোবা বৃক্ষের বুক ছুঁয়ে তবু রোদ উঠে
মৃত্যুর সকালে;
মুছে যায় জলচাঁদ!
-জলচাঁদ;১২পৃ.)

কবিতা কেন শুধু আজকাল যে কোন শিল্পে বৃদ্ধি পাচ্ছে সাঙ্কেতিকতার অনিশ্চিয়তা,অস্পষ্টতা,অনেক ক্ষেত্রে দুর্বোধ্যতা, রহস্য ও ব্যঞ্জনা। তবে জগৎ ও জীবনের মৌল পরিচিতি থেকে খুব সীমিত অর্থে পলায়ন করতে সক্ষম হয় দেশ- কাল ও অভিজ্ঞতার প্রসারমান পরিপ্রেক্ষিতে। সেবক বিশ্বাসের কবিতাগুলোর দিকে তাকালে মনে হবে পৃষ্টার উপর কালো কালির অনিয়ন্ত্রিত আঁচড় শুধু। কিন্তু কবিতায় আঙ্গুল বসিয়ে অক্ষর ধরে এগুলো দ্যুতিতে চমকাবে পাঠকের পুরো শরীর, এমনকি হৃদয়ে সঞ্চারণ ঘটবে কবিতার নন্দনতত্ত্বের বিদ্যুৎতরঙ্গ।
ধৈর্যের সমুদ্র শুকিয়ে গেছে –
আর অপেক্ষা নয়।
এবার আকাশ হবো স্পর্ধায়,
দুর্বিনীত আমি
রাত্রির পুচ্ছে বেঁধে দেব সূর্যকে;
ছাই হবে অন্ধকার!
-স্পর্ধা ; ১৪ পৃ.)

খ. সমুদ্যত ক্ষোভের সম্মিলনে
জমা হচ্ছে অযুত শক্তি,
কোনো এক বিতপ্ত মধ্যাহ্নে
ঘটে যাবে নিশ্চিত দ্বিতীয় বিগব্যাং
– দ্বিতীয় বিগব্যাং; ১৫ পৃ.)

গ. গলাকাটা ধানের মতো শুয়ে আছে
স্বপ্নক্ষেত,
তবু
কিশোরীর ক্লান্ত খোঁপায় খাদ্য খোঁজে
ক্ষুধার্ত কাদাখোঁচা।
এখানে সূর্য নেভে; ২১ পৃ.)

কবি সেবক বিশ্বাস কবিতা লিখেন না,কবিতা এসে লেখায় নয়তো শব্দপরিসংখ্যানে অতুলনীয় মাধুর্য আর প্রতিটা কবিতার নামকরণ এতো চমকপ্রদ হতো না। এটা অতি সহজ ও সহজাত ব্যাপার তার কাছে,কেননা সেবক বিশ্বাস হয়ে গেছে কবিতার সম্পদ। আর এভাবেই কবিতার সংসারে কবিতাগুলো হবে রসে ও গুণে অন্যরকম বলার অপেক্ষা রাখে না। সেবক বিশ্বাসের এই দ্বিতীয় কবিতার বই ” ভাঙা বেহালার অন্ধকার” এ যে সমাজে ও রাষ্ট্রে অসংলগ্নতা কবিকে বিমূঢ় করেছে,তাতে অচিরেই স্বপ্নফুল ফুটুক,এটাই আমার কামনা। নয়তো সেবক বিশ্বাসের মুখে মুখে বলতে হবে-
কিনে খেতে হবে হয়তো একদিন আজকের অবারিত অক্সিজেন,সূর্যপ্রভা।
– পৃথিবী তোমার একার নয়; ১৭ পৃ.)

Share Button