হঠাৎ থেমে-যাওয়া একফোঁটা বৃষ্টি।। নাজমে ফুরকানুল হক

শনিবার, জুন ১৬, ২০১৮ ২:০৫ অপরাহ্ণ
Share Button

বৃষ্টিকে,
তখনও বৈশাখ আসেনি। চৈত্রের লোমকূপে সবে জমতে শুরু করেছে বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা। এমনই কোনো এক দুপুরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে তুমি। উত্তর আকাশ থেকে একখন্ড- মেঘ হয়ে ভেসে এসেছিলাম আমি দক্ষিণ আকাশে থাকা তোমাদের দ্বিতল ভবনে। দু দিন আগে তুমি ডেকে বলেছিলে “মেঘ, এসে দ্যাখা দিয়ে যাও না একদিন?” উত্তরে আদুরে গলায় আমি জানিয়েছিলাম “চিনতে পারবে তো?” জোর গলায় সম্মতি জানিয়েছিলে তুমি। হয়েছিলও তাই। ভেসে আসা মেঘকে চিনতে ভুল করেনি বৃষ্টি। আলস্যহীন আন্তরিক আতিথ্যে ভালো লেগেছিল আমার। ফেরার সময় তো চকচক করছিল তোমার চোখের কোণও।
এরপর কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। মেঘ আর বৃষ্টি আরও গাঢ় হয়েছে। গভীর হয়েছে চোখের ভাষা। রীতিমতো প্রথা ভেঙে কালো মেঘের ঐতিহ্য সংস্কার সব খান-খান করে অসময়ে ছুটে গেছি তোমার কাছে। শৃঙ্খলা ভেঙেছিলে তুমিও, বেশ কয়েকবার। একবার তো একটা মন্দিরে বসতেও গেছিলাম দুজনে। কিন্তু পড়ন্ত বিকেলে দুজনকে একসাথে দেখে ক্ষেপে উঠেছিল পাড়ার লোকেরা। আমরা একসাথে থাকলে তাদের নাকি ছাতামাথায় আসতে হবে, কী অদ্ভুত যুক্তি!! তোমার মনে পড়ে, বৃষ্টি? আমি বলে উঠেছিলাম “তুমি একা আসলে হয়তো বকা খেতে হতো না। “হতচকিত হয়ে তুমি বলেছিলে “তোমার গায়ে কি ছাপ মারা আছে?” কথাটা আজো ধ্বনিত হয় আমার কানে। অগত্যা মরানদীর ধার ধরে হেঁটে হেঁটে ফিরেছিলাম আমরা যে যার ঠিকানায়। সবই অবশ্য আকাশকে ফাঁকি দিয়ে।

এরই মাঝে তোমাকে পাঠিয়েছি বেশ কয়েকটা চিঠি। চিঠির ভাষায় রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ:
‘‘ভালো আছি ভালো থেকো/ আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো/ দিয়ো তোমার মালাখানি/ বাউলের এই মনটারে ” তুমিও আবদার মিটিয়েছিলে। চিঠির উত্তর পাঠিয়েছ বাঁধ ভেঙ্গে। আমাদের একসাথে দেখে অনেকে কটাক্ষ করেছে, ‘‘এরা কালিদাসী নয়, আধুনিক মেঘবৃষ্টি, সেলফোনের ব্যবহার জানে। অফার-ভ্যালিডিটি-প্রিপেইড-পোস্ট পেইড সব বোঝে।’’  তুমি যে ভালো ইংরেজি জানো, এটাও বলত ওঁরা। বৃষ্টি, জানো, তোমার পাঠানো সবকটা মেসেজ আমি আজও আমার ‘গোল্ডেন ট্রেজারি’র ইনবক্সে গোপন পাসওয়ার্ড দিয়ে লুকিয়ে রেখেছি। এগুলো যে আমার সুদহীন মূলধন। দিনযাপনের নিমিত্ত। সুখস্মৃতির চ্যবনপ্রাশ।

দিন গেল। বৈশাখ এলো এরপর। এলো আচমকা কালবৈশাখীও। আমাদের সব বোঝাপড়া হিম হলো। এর আগে তোমার কাছে প্রায়ই জানতে চাইতাম “তুমি দূরে সরে যাবে নাতো, বৃষ্টি?”  আর তুমি প্রতিবারই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত কণ্ঠে বলতে “না, বললাম তো থাকবো…।”  শব্দের কম্পন কমতে কমতেই মিলিয়ে যেত তোমার কথা। এক বুক ভরসা নিয়েও আবার বিষণ্নতা জড়িয়ে ধরত আমাকে, আষ্টেপৃষ্ঠে। কারণ আমি জানতাম “বৃষ্টি মানে অবকাশ/ বৃষ্টি শ্যামলা স্মৃতি/ বৃষ্টি মানে পিছুটান/ শ্যামলিমার গান”
তারপর । সময়টা মধ্য আষাঢ় ছুঁই ছুঁই। তুমি অসুস্থ। তোমার সাথে আমার অনেকদিন দেখা নাই। তারপর আচমকা একদিন, তখন বিকেল। আকাশও কাছে নেই। তুমি এসেছিলে। সাথে একটু মেঘের ঠোকাঠুকি আর দমকা হাওয়া। তারপর বৃষ্টি থেমে গেছে। বর্ষাকাল পেরিয়ে শীতকাল পেরিয়ে এখন গ্রীষ্মকাল আসন্ন। কিন্তু তোমার দেখা নাই। তোমাকে কত জায়গায় না খুঁজেছি! পাহাড় নদী রোদ ছায়া শীত কুয়াশা মেঘ বৃষ্টি অরণ্য সবখানে, ভীষণ ব্যাকুল হয়ে।

একবার “বৃষ্টি নামল যখন আমি উঠোন পানে একা/ দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাব দেখা / হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলি গাছের তলে/ আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছ আকাশছেঁচা জলে/ কিন্তু তুমি নেই বাহিরে…” আমি আবার চুপচাপ, আবার আমার “…অন্তরে মেঘ করে/ ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে।” (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

তুমি কি অন্য কোথাও যেতে পারো? এই কথাটা ভাবতেই আমার মনে পড়েছে ব্রাউনিং ‘‘Where the heart lies, let the brain lie also.’’ আর চোখে জমেছে কালি। মুখ হয়েছে ফ্যাকাসে আর শরীর শুকিয়ে কাঠ। তোমার সাড়া না পেয়ে মৌন হয়ে চলে গিয়েছি অনে—ক দূর। তুমি জানতে কি ব্যাপারটা? হয়তো…, বা হয়তো না। এভাবেই দিন কেটেছে; কেটেছে নিঝুম রাত, নির্ঘুম রাত, রাতের পর রাত। তুমি টেরও পাওনি।

  • তবু আমি স্বপ্ন দেখি। তুমি তো জানো, আমি অনেকটা রবার্ট ব্রাউনিং-এর মতো আশায় আশায় ঘর বাঁধি, আশার চিলেকোঠায় বাস করি। আমি আজও ঘুমভাঙা জানালার বাইরের আকাশে ‘কান পেতে রই’। পাছে আবার শুনতে পাই তোমার গান… “তোমায় নিয়ে হাজার বছর বাঁচতে বড় ইচ্ছে হয়/ ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়”। ভালো থেকো।।
    -ইতি, মেঘ

লেখক: গবেষক, ইংরেজি বিভাগ, লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত

Share Button

আপনার মতামত দিন