আমরা কি মানুষ?।। শামীম আজাদ

মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭ ৪:২৫ অপরাহ্ণ
Share Button

অগ্নিবলয়ের মধ্যে ভূমিষ্ঠ হওয়া সদ্যোজাত শিশু,
পৃথিবীর ছাড়পত্র পায়নি সে, রাখা হয়নি নাম,
হবেও না কোনদিন।
কালের বিবর্তনে ইতিহাসের বিবর্ণ পাতায় হবেনা মলিন,
প্রিয় জন্মভূমি রাখাইন।
পরমানন্দে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে শিশুটি,
ঘুমের মধ্যে ভাবছে হয়তো, এ বসুন্ধরা তার জন্যে নিরাপদ নয়!
ভাবছে বড় হতে পারবো তো?
মাকে ‘মা’ এবং বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারবো?
ঘনকালো মেঘে ঢাকা আকাশ। গুড়গুড় ডাকছে দেয়া;
এই বুঝি সুচির তান্ডবে লন্ডভন্ড হবে আসমান জমিন!
সেখ আব্দুর রহিম স্ত্রী তাহেরাকে বলছে, তাড়াতাড়ি কর বউ,
এখানে আর এক মুহূর্ত নয়?
তাহেরা গায়ে বোরকা জড়িয়ে তড়িঘড়ি করে
সন্তানকে বুকে নিয়ে স্বামীকে বললো চলেন;
গন্তব্য বাংলাদেশ।
হায়রে মুসলিম নারী! যমদূত দুয়ারে দাঁড়িয়ে, তারপরেও পর্দা?
এটাই ইসলাম, এরাই মুসলিম।
গাঁয়ের শেষপ্রান্তে এসে পেছনে তাকিয়ে প্রত্যক্ষ করে রহিম সেখ,
বাপদাদার পৈতৃক ভিটেয় দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন;
আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ অন্তর আজ ক্ষতবিক্ষত।
রহিম সেখ উর্ধ্বপানে তাকিয়ে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানায়,
হে আল্লাহ্! গজব নাজেল করো এই শয়তানদের উপর?
দ্রুত হাঁটতে থাকে তারা। গন্তব্য একটাই-আত্মার বন্ধন বাংলাদেশ!
মন টানছেনা জন্মভূমি থেকে অনিচ্ছায় পালিয়ে যেতে,
ভাবতেই দু’নয়নের জল টপটপ করে পড়ছে রাখাইনের মাটিতে।
আর সেই জল গড়িয়ে গড়িয়ে নাফ নদীর জলের সাথে মিশে
হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
অবশেষে হাঁটতে হাঁটতে নাফ নদীর কূলে এসে ওরা দাঁড়ায়,
সঙ্গে খাবার যা ছিলো তাও ফুরোয়।
মাসুম শিশুটি তাহেরার শুকনো স্তন চোষতে চোষতে
কখন চিরনিদ্রায় চলে গেছে মা খেয়ালই করেনি।
এখন রহিম সেখ এবং তাহেরার চোখ বেয়ে কান্নার জল আসছেনা।
শোকে পাথর, বুঝতে পারছেনা কি করবে?
ক্লান্তিমাখা শরীর নিয়ে দুজনেই বসে পড়ে নাফের কূলে।
পেছনে পড়ে রয় ইতিহাস, প্রিয় জন্মভূমি রাখাইন।
প্রিয় না ছাই! কই রাখাইন আমাদের ধরে রাখতে পেরেছে?
নিজেই নিজেকে শুধায় তাহেরা।
ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো তাহেরার,
সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছে মানুষরুপী দানবের তান্ডবে।
এ সময় চপিচুপি নাফ বলছে, ভয় কি রে মা! নেমে আয় আমার বুকে;
অনন্তকাল থাকবি তোরা সুখে।
তোদের মতো হাজারো পরিবার আশ্রয় নিয়েছে আমার কোলে।
এইতো জীবন, এইতো পৃথিবী! কাঁদিসনে মা।
ভয় পেয়ে তাহেরা জড়িয়ে ধরে স্বামীকে।
হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে আসে দু’জনের গুলির শব্দে,
পেছনে তাকাতেই নজরে আসে একদল বর্মী হায়েনার।
উপায়ান্তর না দেখে কলিজার টুকরো সন্তানকে নিয়েই ওরা
ঝাঁপিয়ে পড়ে নাফের জলে।
শান্তি! শান্তি! পরম মমতায় ওদের আশ্রয় দেয় নাফ।
তারপর! তারপর? কাব্যের জগতে ঘটে ছন্দের পতন!
কবিতা হারায় ছন্দহীন তাল লয়। কবি চলে যায় গল্পে।
যে গল্পের শেষ নেই, একেবারে জীবনের গল্প।
নিকষকৃষ্ণে ঢাকা ভূবন। জোঁনাকির আলোয় অবিরাম লিখে চলেছে কবি।
চোখে ঘুম নেই। ঘুম কেড়ে নিয়েছে মনুষ্যত্বের বিবেক,
তৈরী করছে হাজার হাজার গল্প।
সময়ের প্রয়োজনে কবিদের হতে হয় গল্পকার; লিখতে হয় গল্প।
আর রোহিঙ্গারা? নিরাশার স্বপ্নে বিভোর তাদের দু’চোখ।
সীমাহীন গন্তব্যের খোঁজে প্রশ্ন; আমরা কি মানুষ?

Share Button