একটি ভাবনার খসড়া ।। শাশ্বত ভট্টাচার্য

0

একটি ভাবনার খসড়া

শিল্পের ক্ষেত্রে  ‘কাকে বলে’, ‘সংজ্ঞা’, ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ’ ‘একাডেমিক তাত্ত্বিকতা’ শিল্পের চরিত্র হনণের জন্য মোক্ষম একটি উপায়। একটি গোলাপফুলকে টোটালি দেখতে হয়। তার পাঁপড়ি-দল-বৃন্ত এইসব কাটাছেঁড়া করলে গোলাপকে হত্যা করা হয়, তার পূর্ণাঙ্গতা নষ্ট হয়।

কিন্তু তারপরও গোলাপ হত্যা হয়, প্রয়োজনে হয়, মানুষের জানার অসীম আগ্রহ জনিত কারণে। উদ্ভিদতত্ত্ব জনিত কারণে, অজনাকে জানবার কারণে। এই জানার কারণেই শিল্পকেও হত্যা করা হয়। সেখানে ছুড়ি-কাঁচির কাটা-ছেঁড়া না হলেও আরেকভাবে তাকে কাটা-ছেঁড়া করা হয়। করে দেখা হয় কী আছে তার ভিতর, কী আছে শিল্পীর চেতনার রং, চেতনার কোন স্তর থেকে আঁকা হলো একটি ছবি, লেখা হলো কবিতা, বানানো হলো গল্প, গানে সুরের উৎসারণই বা হলো কোথা থেকে।

এইসবের পক্ষে-বিপক্ষে রয়েগেছে নানান কথা। রবীন্দ্রনাথ যখন ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় লিখলেন-

‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা

ছোট ছোট ছোট দুঃখ কথা’

তাকেই ছোট গল্পের সঙ্গা বলে একাডেমিশিয়ানরা লুফে নিলেন। অথবা কিপলিং যখন বললেন যে, ছোটগল্প লণ্ঠনের চেরা আলোর মতো, অথবা ওয়ার্ডস্বর্থ কবিতা লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে এক অমোঘ ( অনেকের মতে) মত ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘বেস্ট ওয়ার্ড ইন দ্যা বেস্ট অর্ডার’ তাতেই জানা হয়ে গেলো পুরোটা? এই সংজ্ঞাই কি প্যারামিটার গল্প-কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে? শিল্প কি এতটাই গাণিতিক পদ্ধতি মেনে চলে? মেপে-জুকে পা ফেলে? নিশ্চয় নয়। রবীন্দ্রনাথ গল্পের সংজ্ঞা দিয়েছেন  বলে যাকে আমরা মান্য করছি সেই রবীন্দ্রনাথই এই ফরমুলায় ফেলে তাঁর গল্প লেখেন নি।

সুতরাং, আমার কাছে অন্তত, সংজ্ঞার  আলোকে নয় বরং নিজের অন্তর্গত আলোকে শিল্প-সাহিত্য পাঠ ও নির্মাণ করা প্রয়োজন। সাহিত্যকে একটি বৃহৎ ক্ষেত্র থেকে দেখার দিকে আমাদের চোখ ফিরিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি সাহিত্যকে একটি ‘মানসিক সমাজ’ বলে চিহ্নিত করেন। বিস্তৃত করে লেখেন-

সাহিত্যের মধ্যে মানুষের হাসি কান্না, ভালোবাসা, বৃহৎ মানুষের সংসর্গ এবং উত্তাপ বহু জীবনের অভিজ্ঞতা, বহু জীবনের স্মৃতি সবশুদ্ধ মানুষের একটা ঘনিষ্ঠতা পাওয়া যায়।

‘সাহিত্যের প্রাণ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আরো জানান এবং ভীষণ স্পষ্ট,‘আমার প্রধান কথাটা এই সাহিত্যের জগৎ মানেই হচ্ছে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিত জগৎ।’ রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যাটি অসাধারণ। উদ্ধারযোগ্য-

বিজ্ঞানের সূর্যাস্ত হচ্ছে নিছক সূর্যাস্ত ঘটনাটি; চিত্রের সূর্যস্ত হচ্ছে কেবল সূর্যের অন্তর্ধান মাত্র নয়, জল স্থল আকাশ মেঘের সঙ্গে মিশ্রিত করে সূর্যাস্ত দেখা; সাহিত্যের সূর্যাস্ত হচ্ছে সেই জল স্থল আকাশ মেঘের মধ্যবর্তী সূর্যাস্তকে মানুষের জীবনের উপর প্রতিফলিত করে দেখা।

সুতরাং টোটাল একটি অবজারভেন। প্রকৃতির মাঝে মানুষ এবং মানুষের মাঝে প্রকৃতি সবমিলিয়ে অবলোকন। ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও’।

কাব্য সম্পর্কে ওয়ার্ডস্বর্থের মত, ‘ breth and finder and sprit of all knowledge’। ওয়ার্ডস্বর্থের মতকে আরেকটু নজর দেয়া যেতে পারে-

Its object is truth. Not individual and local, but general and operative; not standing upon external testimony but carried alive into the heart by passion; which gives competence and confidence to the tribunal to which it appears and receives them from the same tribunal.

তাই ভাবা যায় শিল্পকে, তা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান ছবি যাই হোক না কোনো তাকে সংজ্ঞার ছুড়ি-কাঁচির তলে ফেলে বুঝতে গেলে বা উপলব্ধি করতে গেলে শিল্পের পূর্ণঙ্গতার কাছে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পরে। এখন একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে এই বুঝে নেবার কি কোনো পদ্ধতি আছে? উত্তরে বলা যায় আছে, আর তা হচ্ছে উপলব্ধি, চেতনার উপলব্ধি।

কি করে ব্যাখ্যা হয় জীবনানন্দের এইসব উজ্জ্বল পংতিগুলির ‘শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা নামে’, ‘ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল,  অথবা সুধীন্দ্রনাথের, ‘একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে ভর করে ছিলো সাতটি অমরাবতী’, অথবা,‘খুঁজেও পাবেনা তারে বর্ষার অজস্র জলধারে’।

যা ভাবা হলো বা লেখা হলো উপরে তা বিতর্কের দরজা খোলা রেখেই হলো।

সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের from- content দুটোই বদলে যায় এই বদলকে মাথায় রেখে ‘নির্মাণ আর কৌশল’ পাশাপাশি উপলব্ধি বদল হয়ে যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ বা ওয়ার্ডস্বর্থ কেউই অমোঘ বিধানকারী হতে পারেন না।

পরিশেষে ছোট করে নিবেদন করি- যারা লিখতে চাই তারা সংজ্ঞায়নের ছুড়ি-কাঁচির নিচে নিজের মাথা পেতে দিয়ে যেন মুন্ডিতমস্তক না হয়ে উঠি।

Hits: 65

আপনার মতামত দিন