প্রসঙ্গ: একুশের প্রথম কবিতা।। তাপস মজুমদার

মহান  একুশে ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিশেষ প্রবন্ধ

প্রসঙ্গ: একুশের প্রথম কবিতা

প্রতি বছর ভাষার মাস এলেই আমরা আমাদের ভাষা আন্দোলনের বেদনাবিধুর ইতিহাসকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানাই সেইসব বীর বাঙালি সূর্যসন্তাদের। যাদের রক্তে কেনা আমাদের প্রাণের বর্ণমালা। রক্তে কেনা বর্ণমালার ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে বুকে লালন করে, হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের বহু কবি সাহিত্যিক রচনা করেছেন অনেক কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ। এমনি একুশের প্রথম রক্তঝরা কবিতাটি লিখেছিলেন মাহবুব আলম চৌধুরী। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সরাসরি ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন চট্রগ্রাম প্রাদেশিক ভাষা আন্দোলন কমিটির সদস্য। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে চট্টগ্রাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মাহবুব উল আলম ছিলেন এই কমিটির আহবায়ক।

২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচী সফল করার জন্য চট্রগ্রামের নেতা-কর্মীরাও ব্যাপকভাবে প্রচার চালিয়েছিলেন শহর ও গ্রামগঞ্জে। নির্ধারিত কর্মসূচীর আগের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়েন। জল বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলেন তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা যে মিছিল বের করেছিলো সেই মিছিলে পুলিশ গুলি চালালো। মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলো।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি হয়েছে এ খবর যখন মাহবুব উল আলম শুনলেন তখন তাঁর গাঁয়ে ১০৪ ডিগ্রী জ্বর। সে সময় তাঁর নিজের হাতে কোন কিছু লেখা সম্ভব না। পরিচর্চাকারী ননী ধরকে বললেন আমিতো লিখতে পারবো না। আমি বলছি তুমি খাতা কলম নাও। কবি বললেন, ননী ধর লিখলেন একুশের প্রথম কবিতা। কবিতাটি হাতের লেখায় ছিলো ১৭ পৃষ্টা। কবিতার শিরোনাম-“কাঁদতে আসিনি,ফাঁসির দাঁবি নিয়ে এসেছি”। কবিতার প্রথম কয়েকটি পংক্তি এরকম- “ওরা চল্লশজন কিংবা আরো বেশী/ যারা প্রান দিয়েছে ওখানে-রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়/ ভাষার জন্য,/ মাতৃভাষার জন্য-বাংলার জন্য”। কবিতাটি পরবর্তীতে মাহবুব উল আলমের সূর্যস্তের রক্তরাগ কাব্যগ্রন্থে অন্তভূক্ত হয়।

এই কবিতা যেদিন লেখা হলো সেদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় নেতা খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস কবিকে দেখতে এসেছিলেন। কবি তখন বেশ অসুস্থ তবুও কবিতাটি পড়ে শোনালেন তাঁকে। ইলিয়াস বললেন, এখনই এ কবিতাটি ছাপতে হবে। পুস্তিকা আকারে প্রকাশের দায়িত্ব নিলেন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। আন্দরকিল্লার কোহিনুর প্রেস থেকে পুস্তিকা আকারে ছাপা হলো একুশের প্রথম কবিতা। এক ফর্মার এই পুস্তিকার প্রথম পৃষ্টায় ছিলো কবিতার শিরোনাম “কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি” নিচের দিকে ছিলো কবির নাম মাহবুব উল আলম চৌধুরী। প্রকাশকের নাম ছিলো কামাল উদ্দিন খান এবং মুদ্রাকার প্রেসের ম্যানেজার দবির উদ্দিন আহমদ। শীতের রাতে কম্পোজ ও প্রুফের কাজ যখন প্রায় শেষ সেই সময় পুলিশে হানা দেয় প্রেসে। আঁচ করতে পেরে পালিয়ে যান খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। সাথে নিয়ে যান কম্পোজ ম্যাটার। পুলিশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে কিছু না পেয়ে চলে যায়। পরে একরাতে প্রায় ১৫ হাজার কপি ছাপা হয় এই পুস্তিকা বিতরণ ও বিক্রির জন্য।

ঢাকায় একুশের মিছিলে পুলিশের গুলি ও হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ২৩ ফেব্রুয়ারি সমগ্র চট্টগ্রামে ধর্মঘট পালিত হয়। লাল দিঘির ময়দানে বিকাল তিনটায় সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভায় “ কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি ” কবিতাটি আবৃত্তি করলেন চট্রগামের তৎকালীন তরুণ প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী চৌধুরী হারুনুর রশীদ। কবিতাটি যখন একজনের মুখ থেকে অন্য জনের মুখে মুখে ঠিক তখনই কবিতাটি নিষিদ্ধ করলো সে সময়কার সরকার। মাহাবুব উল আলমের নামে হুলিয়া জারি হলো। বোরকা পরে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন কবি। আত্মগোপনে ছিলেন নয় মাস। কবিতাটি লুকিয়ে রাখা ছিলো কবির বাড়িতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কবির বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। মাহবুব উল আলমের লেখা একুশের প্রথম কবিতাটিও পুড়ে গেল।

তারপর থেকে কবিতাটি খুঁজতে থাকেন কবি। দৈনিক বাংলা পত্রিকার এক স্বাক্ষাতকারে কবি জানালেন- তাঁর কাছে কবিতাটি নেই। এরপর টেলিভিশনের মাধ্যমে তিনি আবেদন করেছিলেন কবিতাটি পাওয়ার জন্য। এরপর নারী কন্ঠের একটি ফোন পেলেন একদিন। নাম তার মঞ্জুরা বেগম। তিনি বললেন কবিতাটি তার কাছে আছে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় মঞ্জুরা ছিলেন দশম শ্রেণীর ছাত্রী। মঞ্জুরার ভাই আশরাফুল হক। তিনি ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল তল্লাশি চালাতে গিয়ে তিনি কবিতাটি উদ্ধার করেছিলেন। কবিতাটি এনে মঞ্জুরাকে দিয়ে বলেছিলেন কবিতাটি লিখে রেখে মূল কবি পুড়িয়ে ফেলতে। কবিতাটি সেখান থেকে কবি পেলন। কবির কাছে নিয়ে এসেছিলেন সাহিত্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী মীর আশরাফুল হকের ছেলে মফিদুল হক।

কবিতাটি হাতে পেলেন কবি। তবে সেটিই যে সম্পূর্ণ কবিতা কবির তা মনে হয়নি। এরপর কয়েক বছর পার হয়ে যায়। তারপর ১৯৯১ সালে চট্রগাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জহুরুল হক পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি উদ্ধার করেন। তিনি একুশের প্রথম কবিতা শিরোনাম একটি বই লেখেন। তিনি কবিতাটি উদ্ধার করেছিলেন প্যারামাউন্ট প্রসেস এন্ড প্রিন্টিং ওয়ার্কসের স্বত্ত্বাধিকারী আবু মোহাম্মদ তবিবুল আলমের নিকট থেকে। তিনি পেয়েছিলেন কম্পোজিটার নুরুজ্জামান পাটায়ারীর কাছ থেকে। একুশের রক্তঝরা এই কবিতাটি সে সময় আন্দোলিত করেছিলো ভাষা সৈনিকদের।

একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে প্রথম কবিতা,
একুশ নিয়ে কবিতা,
একুশের উপর সর্বপ্রথম কবিতা,
একুশের প্রথম কবিতা,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here