Home / প্রবন্ধ / দাঁড়াও পথিকবর  | তাপস মজুমদার | মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনকথা

দাঁড়াও পথিকবর  | তাপস মজুমদার | মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনকথা

প্রবন্ধ: দাঁড়াও পথিকবর  | মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনকথা

২৫ জানুয়ারি বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের রুপকার, প্রথম সার্থক নাট্যকার, প্রথম প্রহসন রচয়িতা, প্রথম পত্রকাব্যকার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৬ তম জন্মবার্ষিকী ও মধুমেলা- ২০২০ উদযাপন হতে যাচ্ছে তাঁর জন্মভিটা সাগরদাঁড়িতে। কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ৭ দিন ব্যাপী নানা ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের পদচারণায় মুখরিত হবে কপোতাক্ষ পাড়ের এ জনপথ। দেশের স্বনামধন্য কবি, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের পদচারণায় আলোকিত হবে মধুকবির জন্মভিটা। ১৯৯৭ সালে সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষিত সাগরদাঁড়ি ‘মধুপল্লী’র সাধারন মানুষগুলো মেতে উঠবে উৎসবে। কোনো কবি কিংবা সাহিত্যিককে নিয়ে এত বড় জন্মবার্ষিকী উদযাপন ও মেলা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মাইকেল মদুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহন করেন সাগরদাঁড়িতে। তাঁর ছদ্মনাম টিমোথি পেনপোয়েম। পিতা রাজনারায়ন দত্ত মা জাহ্নবী দেবী। পিতা ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের এক খ্যাতনামা উকিল। মধুসূদনের যখন তেরো বছর বয়স সে সময় থেকে তিনি কলকাতায় বসবাস করেন। মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা তাঁর মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। তারপর তিনি সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রাম শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল  হকের কাছে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। তিনি লেখাপড়াতে ছিলেন পরম উৎসাহী। শৈশবেই মায়ের মুখে রামায়ণ ও মহাভারত পাঠ শুনতেন। এই রামায়ণমহাভারত মধুসূদনের কবি জীবনের ভিত্তি স্বরুপ ছিলো।

মধুসূদন ১৮৩৭ সালে কলকাতার লালবাজার গ্রামার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজের সিনিয়র ডিপার্টমেন্টে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি স্ত্রী শিক্ষা সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা করে স্বর্ণপদক পান। মধুসূদন ১৯৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ‘ ওল্ড মিশন চার্চে’  খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেন এবং হিন্দু কলেজ ত্যাগ করে বিশপস কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি মাদ্রাস যান। ১৯৪৮ সালে মাদ্রাজের ‘মেল অরফ্যান অ্যাসাইলাম’ এ ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান। সে সময় তিনি ‘মাদ্রাজ সার্কুলেটর’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে কাজ করেন। একই বছর ৩১ জুলাই রেবেকাকে বিবাহ করেন।

মদুসূদন যখন হিন্দু কলেজের ছাত্র বাংলাদেশের ইয়ং বেঙ্গলের মন্ত্রগুরু অধ্যাপক হেনরি লুই বিভিয়ান ডিরোজিও তখন কলেজ ত্যাগ করেছেন। তবে তিনি সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতির যে বীজমন্ত্র ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার প্রভাব মধুসূদনের মধ্যে প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়।

তাছাড়া ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক রিচার্ডসন ছিলেন মধুকবির কল্পনা জগতের পথপ্রদর্শক। রিচার্ডসনের অনুপ্রেরণায় কবির হৃদয়ে কবি শক্তির যে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিলো তার বিকাশ ঘটে ইংরেজি সাহিত্য চর্চার মধ্যে দিয়ে। মধুসূদন বিজাতীয় ভাবাদর্শে মগ্ন হয়ে ইউরোপের শ্রেষ্ট কবি হোমার, ভার্জিল, মিল্টনের সমপর্যায়ভূক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় স্নেহময় বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন, ধর্ম সুখ-সম্পদ সব পরিত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করে হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কিন্তু যে কবির প্রকৃতির লীলাভূমি সাগরদাঁড়িতে জন্মেছেন, কপোতাক্ষের মাটি ও কাদার সাথে নিত্য অবগাহন করেছেন, তিনি কীভাবে বিজাতীয় সাহিত্যের প্রতি আজীবন আসক্ত থাকবেন। একসময় তিনি বুঝেছিলেন বিদেশী ভাষার প্রতি যতই অধিকার থাকুক না কেন, তাতে ভর করে কোনো চিরস্থায়ী কবি গৌরব অর্জন করা যায় না। তাই ভুল ভাঙার পর বাংলা সাহিত্যের মধ্যে থেকে অমূল্য রতন আহরণের জন্য অনুশীলন শুরু করেন।

পাশ্চাত্য সাহিত্যের মহাকবিদের রচিত কাব্য থেকে তিনি যে রস-মধূ আহরণ এবং ছন্দগঠনের যে যাদুমন্ত্র আয়ত্ত করেছিলেন, অল্প দিনের মধ্যে তারই ফসল মধুকবির অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ কাব্য। বাংলা সাহিত্যে এই নতুন ছন্দে রচিত কাব্যের কথা শুনে বাঘা বাঘা পন্ডিতেরা মধুসূদনের প্রতিভাকে স্বীকার করে নিলেন। রাজনারায়ণ বসু কবির কাব্যকে সংবর্ধনা জানিয়ে লিখলেন: “your reward is very great indeed Immortality.” ১৮৪৯ সালের এপ্রিলে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ  `The Captive Ladie’ প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে ইংরেজিতে কবি বর্ণনা করেন প্রাচ্য ইতিহাস কাহিনী, রুদ্রকালী, অগ্নিলক্ষী ও সরস্বতীর কথা। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য । এর কাহিনী রামায়ণ থেকে নেওয়া হলেও উপস্থাপন রীতিতে মধুসূদন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। কবির ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ (১৮৬১) বৈষ্ণর পদাবলির অনুকরণে আধুনিক রুপে রুপায়িত অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত রাধা বিরহ বিষয়ক কাব্য। এতে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার আধ্যাত্মিক রুপ গ্রহন করে রাধার বিরহের মানবিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘বীরঙ্গনা কাব্য’ (১৮৬২) মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দের সর্বোত্তম নিদর্শন। ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ (১৮৬৬) কবির বাংলা ভাষা ও ছন্দের নিরীক্ষাধর্মিতার শ্রেষ্ট কৃতিত্ব। পৌরানিক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ ও ‘পদ্মাবর্তী’ (১৮৬০) ঐতিহাসিক নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) বিয়োগান্ত নাটক ‘ মায়াকানন’ ( মৃত্যুর পর ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত) । মধুকবি রচিত প্রহসন ‘ একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘ বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এছাড়া অনুবাদমূলক গদ্যরচনা ‘হেক্টরবধ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলা সাহিত্যের এ মহাকবি ১৮৬২ সালের ৯ জুন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশে বিলেত যান কিন্তু ১৮৬৩ সালে ব্যারিস্টারি পড়া বাদ দিয়ে প্যারিসে যান ও ভার্সাই নগরে বসবাস  শুরু করেন। এ সময় জমিদার পুত্র মধুসূদনকে বেঁচে থাকার জন্য খ্রিস্টান পাদ্রির দরিদ্রভান্ডার থেকেও সাহায্য গ্রহন করতে হয়। শুধু তাই নয় এক ফরাসি তরুণীর অর্থ সাহায্যে তিনি জেলের হাত থেকেও রক্ষা পান। ১৮৬৪ সালের ২ জুন অর্থ সাহায্য চেয়ে বিদ্যাসাগরের কাছে চিঠি লেখেন। বিদ্যাসাগর সাহায্যের হাত বাড়ালে তিনি সনেট রচনায় মনোনিবেশ করেন এবং ইংল্যান্ডে গিয়ে আবারও ব্যারিস্টারি পড়া শুরু করেন। ১৮৬৬ সালের ১৭ নভেম্বর ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৬৭ সালে তিনি ভার্সাই থেকে দেশে ফেরেন। একই বছর মে মাসে তিনি হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করার অনুমতি লাভ করেন। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে বেলা ২ টায় কলকাতা আলিপুর হাসপাতালে চিরবিদায় নেন। ৩০ জুন কলকাতা লোয়ার সার্কুলার রোড়ে খ্রিস্টীয় রীতি অনুযায়ী বাংলা সাহিত্যের মহাকবিকে সমাধিস্থ করা হয়।

তাপস  মজুমদার, প্রভাষক, লেখক ও প্রাবন্ধিক

⇒জানেন কি মহাকবি হোমারের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল? এখানে কিল্ক

Hits: 81

About সাহিত্যপুরী

Check Also

প্রসঙ্গ: একুশের প্রথম কবিতা।। তাপস মজুমদার

মহান  একুশে ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিশেষ প্রবন্ধ প্রসঙ্গ: একুশের প্রথম কবিতা প্রতি বছর ভাষার …

%d bloggers like this: