ধর্ষক কোনো ধর্মের দোহাই মানে না!

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৭ ২:১১ অপরাহ্ণ
Share Button

হাদিউল হৃদয়

যে ধর্ষণ করবে সে বোরকা ছিঁড়েও ধর্ষণ করবে, লোহার অর্šÍবাসও তাদের ঠেকাতে পারবে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে বাসনা দমন করা যায়, নিবারণ করা যায় না। ধর্ষণ কোনো আধুনিক ব্যাপার নয় এবং বিশেষ কোনো সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। তবে কোনো কোনো সমাজ বিশেষভাবে ধর্ষণপ্রবণ, আর কোনো কোনো সমাজ অনেকটা ধর্ষণমুক্ত; যদিও সম্পূর্ণ ধর্ষণমুক্ত সমাজ ও সময় কখনই এ জগতে ছিল না, এখনো নেই।  ধর্ষণ আজ দেখা দিয়েছে মারাত্মক মড়করূপে;- আমেরিকার মতো শিল্পোন্নত সমাজে যেমন চলছে ধর্ষণ, তেমনি চলছে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত সমাজে। বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে ধর্ষণপ্রবণ সমাজের একটি।

ধর্ষণ এক প্রকার যৌন অত্যাচার। সারা বিশ্বে বেড়েই চলেছে ধর্ষণ আর নারী নিগ্রহের ঘটনা। নারীর সমভ্রম হরণের প্রবণতা বাংলাদেশের মতো দেশেও হচ্ছে। সংগৃহীত তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন দাবি করেছে, গত এক বছরে ৪২১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৯ নারীকে। প্রতিবছর মাত্র ২ শতাংশ বা তারও কম ধর্ষণ মামলার বিচার হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করার পর খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার হয়। গতবছরের তথ্য অনুযায়ী ৫ হাজার ৮৩৯টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলেও এখন পর্যন্ত এসব মামলার একটিরও বিচার হয়নি এবং ঘটনা ও তথ্য লুকানোর প্রবণতা থাকায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত হবে। একই আইনের ৯ (২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ- হবে।’ একই সঙ্গে সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা এবং ৯ (৩) ধারায় আছে, ‘যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং উক্ত ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদ- বা মৃত্যুদ-সহ কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে’।
ধর্ষণের এই ব্যাপকতার পিছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ মেনে না চলা এবং অপরাধীর শাস্তি না দেওয়া। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাও যথেষ্ট দায়ী। আইন যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা না হয়, যদি ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি বিচার না পান সেক্ষেত্রে ধর্ষণ কমবে না। ধর্ষণ প্রতিরোধ খুবই জরুরি এবং একই সাথে বিচার নিশ্চিত করা আরো জরুরী।‘ধর্ষণ’ – ছোট এই শব্দটির অর্থ এতই বড় যে সারা জীবনেও বললেও বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। পত্র-পত্রিকা, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং এর কল্যাণে শুধু চোখ বোলালেই শত শত ধর্ষণের খবর দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে আহামরি তেমন কোন শাস্তি বা দন্ড দিতে দেখা যায় না। গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে বের হয়ে আসে। সত্যিই যারা ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চান, সমাজকে ধর্ষণ নামের অভিশাপ মুক্ত করতে চান- তারা আজই কিছু করুন। একজন ধর্ষণকারী এবং একজন খুনীর মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখিনা। এরা শুধু মানুষ হত্যা করে না – মানবতাকে হত্যা করে। একজন খুনীর যদি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হতে পারে, তবে একজন ধর্ষকের কেন নয়? সৌদি আরবে খুন আর ধর্ষণের শাস্তি কতটা ভয়ানক তা আমারা সবাই কম বেশী হলেও জানি এবং না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। ভোগবাদী সমাজে নারীমুক্তির স্লোগানের আড়ালে নারীরা চিরকালই ভোগের পণ্য? যে দেশে সরকার প্রধান নারী, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, স্পিকার নারী, সংসদ সদস্য নারী, সেই দেশে কেন এতো নারী ধর্ষণ? নারী নির্যাতন? এর কি কোন প্রতিকার নেই?
‘উন্নত দেশেও ধর্ষণ হয়, অপরাধ হয়। তবে সে দেশে অপরাধের অন্তত বিচার হয়। আর আমাদের দেশে অপরাধী রাজার হালে বুক ফুলিয়ে ঘোরে। কোন বিচার হয় না। গত ৪ বছরে ১৩ হাজার ধর্ষণ : নারী নির্যাতন ৬৭ হাজার। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমই হল এর এক মাত্র প্রতিষেধক। আমাদের দেশে ধর্ষক বুক ফুলিয়ে, কলার উঁচু করে বীরের বেশে এলাকায় ঘুরে বেড়ায় আর ধর্ষিতার স্থান হয় নির্জন ঘরের কোনে- যদি সে বেঁচে থাকে পত্রিকার পাতায়, ফেসবুক, কলামে কলামে, থানায় পুলিশের ডাইরিতে, আদালতে উকিলের আপত্তিকর জেরায়। একটি ধর্ষিতা মেয়ের জন্যে কেউ নিরাপদ না। শিক্ষক, সহপাঠী, বন্ধু, এলাকার ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়- পুরুষ, চাচা-মামা-খালু, দুলাভাই কেউ না। আবার কর্মক্ষেত্রে কলিগ, অফিসের বস- সুযোগ পেলেই মিষ্টি হাসি ঝেড়ে ধর্ষকের রূপ ধরতে মুহূর্ত দেরি করেন না। বাসের হেল্পার, ক্যান্টিনবয়, হাসপাতালের ঝাড়ুদার, বাসার দারোয়ান, নৌকার মাঝি, ট্রাকের টোকাই কিংবা অফিসের পিয়ন- ওটার ব্যবহারে কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। আমাদের জীবনে যৌনতা কখনো শিক্ষা হয়ে ধরা দেয়নি, নারী কখনো মানসী হয়ে ওঠেনি। যৌনাচার কখনো সভ্যতা রূপে আসেনি, নারী কখনো সঙ্গী হয়ে ওঠেনি। পুরুষ নারীদেরকে যৌনসঙ্গী মেনে নিয়েছে, জীবনসঙ্গী, প্রেমিকা নয়। সৃষ্টির আদি থেকে নারী-পুরুষের মাঝে লৈঙ্গিক সম্পর্ক আছে। মানুষের সম্পর্ক ক্ষণে ক্ষণে কালে কালে ভেঙে পড়েছে বারংবার। মেয়েরা কার কাছে বিচার চাইবে? শিক্ষকের কাছে? তারাই তো রুমে ডেকে নিয়ে ছাত্রী ধর্ষণে লিপ্ত। মন্ত্রীদের কাছে? এই দেশের বিভিন্ন সময় কলেজের মেয়েদের তো তাদের কাছে উপঢৌকন হিসেবেই পাঠানো হয়। শরীরের বিনিময়ে মিলে চাকুরী কিংবা পার্টিতে পদ অথবা হলে সিট।
ধর্ষণ শুধু নারীর দেহপ্রাপ্তি হলে নিরীহ পশুপাখিরাও মানুষের ধর্ষণের স্বীকার হতো না। যে ধর্ষণ করবে সে বোরকা ছিঁড়েও ধর্ষণ করবে, লোহার অন্তর্বাসও তাদের ঠেকাতে পারবে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে বাসনা দমন করা যায়, নিবারণ করা যায় না। জাগ্রত অতৃপ্ত বাসনা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো। কারো কারো জীবনে সে কোনদিনও অগ্নৎপাত ঘটায় না, আবার কারো জীবনে সে হঠাৎ করে লাভা উদগীরণ করে দেয়। নারীবিহীন জীবন হলেও ধর্ষণের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। জ্বালামুখ না থাকলে অগ্নৎপাতর সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না, বিষ্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনাও থাকে। সমাজে কোনো মানুষ যেমন ধর্ষক হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, তেমনিভাবে হঠাৎ করে একজন মানুষ ধর্ষকের ভূমিকায় নামতে পারে না। শুধু ধর্ষণকাম, রতিসম্ভোগ ধর্ষণের জন্য দায়ী নয়। এর পেছনে দীর্ঘ পারিবারিক, মনোঃসামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাস থাকে যার সূত্রপাত ঘটে ছেলেবেলায়। এ পৃথিবীটা পুরুষতান্ত্রিক, পুরুষশাষিত সমাজে ভরপুর, তাই ধর্ষণে পুরুষরাই অগ্রগামী এবং একমাত্র মহানায়ক। তবে, নারী কর্তৃক ধর্ষণ কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক সমাজে মেয়েরাও পুরুষকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে, জোর করে নারী সমকামিতায় লিপ্ত হয়। ধর্ষণ কেবল যৌনসম্ভোগ হলে তিন বছরের মেয়ে, পয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধা ধর্ষিত হত না। কিন্তু আমাদের সমাজে সমকামিতা বা পুরুষ ধর্ষণ এখনো ধর্তব্য নয়।

মনুষ্য চেতনার যে স্তরে মানুষ ধর্ষণে প্রবৃত্ত হয় সে স্তরে কোনো নীতিবোধ কাজ করে না, কোনো ধর্মের দোহাই চলে না, কোনো আইনের ভয়ও নেই সেখানে। আইন করে ও আইনের কঠোর প্রয়োগ করে ধর্ষণকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, বন্ধ করা যাবে না। ধর্ষককে নিবৃত্ত করা যাবে বলে মনে হয় না। আমরা যৌনাচারের উর্ধ্বে কোনো অতিমানব নই, নপুংসকের মতো যৌনাচারের নিম্নেও নই। আমরা স্বাভাবিক মানুষ, আমাদের যৌনতা ও জৈবিকতা অস্বীকারের কোন উপায় নেই। অসুস্থ যৌন অত্যাচার প্রতিরোধে সুস্থ যৌনাচারকেই অধিক প্রাধান্য দিতে হবে- নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যৌন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে; যৌন উত্তেজক ওষুধ/মাদক/পানীয়ের অবাধ বিচরণ রুখতে হবে; যৌন আবেদনমূলক যেকোনো ধরণের শিল্প-কলা-সাহিত্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; অবাধ ইন্টারনেটের যুগে যতটা সম্ভব পর্ন ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে, মোবাইলের মাধ্যমে অথবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে পর্ণ যেন সবার হাতে হাতে না পৌঁছাতে পারে সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে। সন্তানদের জীবনে সুস্থ যৌনাচার শিক্ষার প্রথম স্তরে পরিবার, দ্বিতীয় স্তরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তৃতীয় স্তরে সমাজ, চতুর্থ স্তরে মিডিয়া ও সর্বশেষ স্তরে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যতদিন সমাজে যৌনাচারকে একটি স্বাভাবিক জৈবিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না ততদিন পর্যন্ত অসুস্থ বা বিকৃত রুচির হলেও যৌনতাড়িত মানুষ যৌন উত্তেজনার বশে জৈবিক চাহিদা নিবারণের জন্য বার বার ধর্ষণ করবে- দ-কারণ্যের দ-ী, দ-াঘাতের ফলে হবে দ-িত। কিন্তু সমাজদেহ থেকে এই ক্যান্সার মনে হয় কখনো দূর হবে না।

 

Share Button