বিপন্ন ধরণী ।। হিরন্ময় রায়

বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে । এই সময় বৃষ্টিতে ভিজতে পারলে মন্দ হতো না কিন্তু বাইরে যাওয়া নিষেধ । বাইরে গেলে দিদি, মায়ের এক গাদা কথা শুনতে হবে । কি আর করার ঘরে বসেই কাটাতে হবে । বাইরে বস্তির ছোট ছোট ছেলেরা বৃষ্টিতে ভিজছে । আমি যদি বৃষ্টিতে ভিজতে পারতাম ! ইস ! ঐ ছেলেগুলো কত সুখী । একা একা আনমনে জানালার কার্নিশের গ্রিল ধরে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছিল সাত বছর বয়সী অনল ।

সুখটা আপেক্ষিক । শুধু সুখ নয় পৃথিবীর প্রায় প্রতিটা জিনিসই আপেক্ষিক । অনল যেখানে দাড়িয়ে বস্তির ছেলেদের সুখের কথা কল্পনা করছে সেটা কিন্তু বস্তির ছেলেদের কাছে আদৌ সুখের নয় । ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভেজাতে আনন্দ আছে কিন্তু বাধ্য হয়ে বাসস্থানের অভাবে বা ঘরের চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে ভেজার মধ্যে আনন্দ নয়, কষ্ট আছে । অনল যেমন বস্তির ছেলের দেখে তাদেরকে  অনেক সুখী ভাবছে তেমনি বস্তির ঐ ছেলেগুলোরই কেউ কিংবা সবাই অনলকে দেখে সুখী ভাবছে । প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকে প্রত্যেকের অবস্থান নিয়ে অসুখী, কেউ নিজের অবস্থান নিয়ে সুখী নয় ।

– অনল বাইরে কি কর ? ঠান্ডা লাগবে ভেতরে আসো ।

ভেতর থেকে মা এর কড়া আদেশ বাক্য ভেসে এলো।

প্রতিদিনের চিরাচরিয়ত নিয়মগুলোকে কেন জানি আজকে ভাঙার ইচ্ছা হলো। নিজের রুমে গিয়ে অনল ভাবছে আজকে সে বৃষ্টিতে ভিজবেই কারও কথা শুনবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। সোজা দ্বিতল থেকে নিচ তলা। নিচ তলা এসে বাগানের দিকে পা বাড়াবে তখনই অনলের চোখ আটকে যায় ভবনের প্রধান ফটকের কাছে। ফটকে দারোয়ান নেই, বাইরে কোথাও গেছে হয়তো। দারোয়ান যেখান থাকে সেখানে একজন বৃদ্ধ  মহিলা বসে আছে। মহিলার সারা শরীরে বহু ক্ষত চিহ্নের দাগ, পড়নের কাপড় ছেড়া, চেহারা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ক্ষত থেকে রক্তের ফোয়ারা বইছে। সেই রক্তের ধারা প্রবাহিত হয়ে বৃষ্টির সাথে মিশে বিবর্ণ জলকে লাল বর্ণ এনে দিচ্ছে। অনল ভয়ে আঁতকে উঠে বৃদ্ধ মহিলার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

– আপনি কে ?

– আমি ধরণী ।

– আপনার এই অবস্থা কি ভাবে হলো?

– আমার সন্তানেরাই আমার এই অবস্থা করেছে।

– আপনার সন্তানেরা আপনার এই অবস্থা করতে পারল? মানুষ এত নিষ্ঠুর কিভাবে হয়?!

– হুম। আমার সন্তানেরাই।

-আপনি তাদের কিছুই বলেন না?

– কি বলব বাবা ! আমি তাদের অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। গাছ কেটো না, বন জঙ্গল ধ্বংস করো না। কিন্তু তারপরও তারা বন ধ্বংস করে কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরী করছে। তারা এটাও বুঝতে পারছে না আমি না বাঁচলে তারাও বাঁচতে পারবে না ।

– আমি আপনাকে বাঁচাবই। চলেন আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই ।

– না বাবা ডাক্তারও আমাকে বাঁচাতে পারবেনা । বৃক্ষ, বন-জঙ্গলই আমার প্রাণ ।

– আপনার শরীর থেকে প্রচুর রক্ত পড়ছে । এটা আগে বন্ধ করি।

অনল, অনল …. কিরে এই বিকেল বেলাতে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস। খেলতে যাবি না। চল খেলতে চল । রবির ডাকে অনলের ঘুম ভাঙ্গে।

– নারে আজকে খেলতে যাবোনা। চল, আজকে সবাই মিলে বিপন্ন ধরণীকে বাঁচাতে যাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here